আসন সমঝোতা কাজে আসেনি: শরিক আসনে হোঁচট খেল বিএনপি
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে দুই শতাধিক আসনে জয় পেলেও নির্বাচনের আগে শরিক দলগুলোর সঙ্গে করা আসন সমঝোতা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বলে মনে করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতারা।
নির্বাচনের আগে শরিকদের জন্য বিএনপি যে ১৪টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল, তার মধ্যে নয়টিতেই জয় এসেছে শরিক জোট বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের মাধ্যমে। এসব আসনে বিএনপি নিজস্ব প্রার্থী দেয়নি এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের শরিক প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দলীয় নেতারা বলছেন, এই কৌশল পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যকর হয়নি।
বিএনপি সূত্র জানায়, হেরে যাওয়া নয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। একটি করে আসনে জয় পেয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও খেলাফত মজলিস-যারা জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ। বাকি তিনটি আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা। দলীয় নেতাদের মতে, যেসব আসনে বিএনপি সরে দাঁড়িয়েছে, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা তাদের সংগঠন ও ভোটব্যাংক আরও সুসংহত করতে পেরেছে। এতে আসন বণ্টন কৌশল এবং তৃণমূল পর্যায়ে সমন্বয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা-১২ আসনে ভাঙা ভোটের খেসারত
সবচেয়ে আলোচিত পরাজয়ের ঘটনা ঘটে ঢাকা-১২ আসনে। এখানে বিএনপি সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি-র সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক পান ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। তিনি জামায়াত প্রার্থী সাইফুল আলম মিলনের কাছে ২২ হাজার ৮১০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। মিলন পান ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট। একই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। বিএনপি নেতারা বলছেন, দল সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থী ঐক্যবদ্ধ হলে ফল ভিন্ন হতে পারত।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বরাদ্দ আসনে শূন্য ফল
বিএনপি শরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-কে। তবে দলটির কোনো প্রার্থীই জয়ী হতে পারেননি। এই চার আসনের একটি গেছে খেলাফত মজলিসের দখলে, একটি বিএনপির বিদ্রোহীর, একটি জামায়াতের এবং একটি এনসিপির দখলে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী রুমিন ফারহানা ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জমিয়তের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব পান ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট। সিলেট-৫ আসনে জমিয়তের উবায়দুল্লাহ ফারুক ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট পেয়ে খেলাফত মজলিস প্রার্থী আবুল হাসানের কাছে পরাজিত হন। নীলফামারী-১ আসনে জমিয়তের মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী হেরে যান জামায়াত প্রার্থীর কাছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তের মনির হোসেন পরাজিত হন এনসিপি প্রার্থীর কাছে।
দল ভেঙে বিএনপিতে যোগ দিয়েও হার
১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের পর কয়েকজন নেতা নিজ নিজ দল ভেঙে বা ত্যাগ করে বিএনপির প্রতীকে নির্বাচন করেন। তবে এর মধ্যেও বড় পরাজয় দেখা গেছে।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণ অধিকার পরিষদ-এর নেতা রাশেদ খান বিএনপির প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় হন। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় দল–এর চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা বিএনপির টিকিটে দাঁড়িয়ে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। কুমিল্লা-৭ আসনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রেদোয়ান আহমেদও বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান। নড়াইল-২ আসনে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-র চেয়ারম্যান ফরহাদ বিএনপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
পাঁচ আসনে জয় পেল শরিকরা
তবে বিএনপি সমর্থিত শরিক দলের পাঁচজন প্রার্থী নিজ নিজ আসনে জয় পেয়েছেন। ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি–র চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ জয়ী হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলন-এর প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি জয় পান। পটুয়াখালী-৩ আসনে গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক জয়ী হন। ঢাকা-১৩ আসনে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-র চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমও জয় পান।
দলীয় সূত্র বলছে, এই ফলাফল বিএনপির ভবিষ্যৎ জোটনীতি, আসন সমঝোতা এবং বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণের কৌশল পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।