গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি, উচ্চকক্ষ নিয়ে নতুন বিতর্ক
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন, ১২ ফেব্রুয়ারি, দেশব্যাপী গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তথ্য অনুযায়ী, মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার জন। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর পর থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার পর গণভোটে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪৭টি ছিল সাংবিধানিক সংস্কারসংক্রান্ত। তবে কয়েকটি সাংবিধানিক প্রস্তাবে **বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল**সহ বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত ছিল।
সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এ কারণে যেসব সংস্কার প্রস্তাবে দলগুলোর ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে বড় কোনো সাংবিধানিক সংকট দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তবে দুইকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
উচ্চকক্ষ: ভোটের অনুপাত না আসনের হিসাব
গণভোটের ব্যালটে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, দলটি ক্ষমতায় এলে সংসদের নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করবে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, বিএনপির ইশতেহার জনগণের সামনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়নি, কিন্তু উচ্চকক্ষ আনুপাতিক হারে গঠনের বিষয়টি গণভোটে সরাসরি জনগণের সম্মতি পেয়েছে। তাঁর মতে, গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবের আইনগত ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্ত।এদিকে, জুলাই সনদের কিছু সাংবিধানিক প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও সেগুলো বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয় বলে মত দিয়েছেন কয়েকজন সংবিধান বিশ্লেষক।
সংস্কার বাস্তবায়নের তিন ধাপ
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনটি ধাপ নির্ধারিত রয়েছে। প্রথম ধাপে রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করা হয়, যা গত ১৩ নভেম্বর কার্যকর হয়। দ্বিতীয় ধাপে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন তৃতীয় ধাপে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংসদ সদস্যরা দুটি শপথ নেবেন-একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং আরেকটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই পরিষদের মেয়াদ হবে ১৮০ কার্যদিবস।
কী কী পরিবর্তনের সম্ভাবনা
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় যেসব সংস্কার বাস্তবায়নের পথ খুলেছে, তার মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, সাংবিধানিক পদে নিয়োগে বহুপক্ষীয় কমিটি, সংসদ সদস্যদের ভোটে স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য জোরদার করা।
এ ছাড়া একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন-এমন বিধানেও শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়েছে বিএনপি এবং তা দলটির ইশতেহারেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হতে পারবেন কি না—এ বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত থাকায় প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের বাইরে থাকতে পারে।
সামনে যে বিতর্ক
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, বিএনপি এককভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রায় ৩২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। জোটভিত্তিক হিসাব ও আসনসংখ্যা অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠিত হলে আসন বণ্টনে বড় পার্থক্য তৈরি হবে। এ কারণেই উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।