দুই শপথের প্রস্তুতি, বিএনপির অবস্থান অনিশ্চিত, জামায়াত অনড়
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করানোর প্রস্তুতি নিয়েছে সংসদ সচিবালয়। তবে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নবনির্বাচিত সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করবেন কি না-এ বিষয়ে সোমবার রাত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জোটের নবনির্বাচিত ৭৭ জন সংসদ সদস্য পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিতে অনড় অবস্থান নিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় শপথ পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। সংসদ সচিবালয়ের পাঠানো অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী, সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণসংক্রান্ত নথি নবনির্বাচিতদের সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে তাঁদের হাতে সংবিধান ও জুলাই জাতীয় সনদের কপি তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৩ নভেম্বর জারি করা আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ দ্বৈত ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করবে। ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েই গঠিত হবে এই পরিষদ, যা সংসদের কার্যক্রমের পাশাপাশি চলবে। পরিষদকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এ জন্য সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পর একই ব্যক্তিদের পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিতে হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির সময় বিএনপি এর বিরোধিতা করেছিল। দলটির অবস্থান ছিল-রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন সংসদের মাধ্যমেই করা হবে। তবে জামায়াত, এনসিপিসহ অধিকাংশ দল আদেশ জারি ও গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে ছিল। বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত থাকায় গণভোট আয়োজনের দাবিও তোলে তারা। বিএনপি প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে গণভোটে সম্মতি দেয়।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পায় প্রায় ৬৮ শতাংশ। অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট প্রায় ৫১ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া নিয়ে বিএনপির অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরিষদ গঠনের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলে তবেই শপথের বিষয়টি কার্যকর হতে পারে। বিএনপির একাধিক সূত্রের ভাষ্য, কেবল গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে নয়, সংসদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই সংস্কার প্রক্রিয়া এগোনো উচিত।
এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছে জামায়াত। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোট জনগণের সর্বোচ্চ রায় এবং এই রায়ের মাধ্যমে জনগণ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত অস্বীকারের সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা সংসদ ও পরিষদ-উভয় পরিচয়ে শপথ নেবেন।
এনসিপির পক্ষ থেকেও একই অবস্থান জানানো হয়েছে। দলটির নেতারা বলেন, গণভোটে প্রদত্ত রায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে।
জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে কিছু প্রস্তাবে বিভিন্ন দলের ভিন্নমত ছিল। গণভোটের মাধ্যমে এসব প্রস্তাব চারটি ভাগে ভাগ করে জনগণের মতামত নেওয়া হয়। যেসব প্রস্তাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদের প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম শেষ করে পরিষদ বিলুপ্ত হবে। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিই পরিষদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।