রমজান মাস এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পরিচিত ‘যুদ্ধ’ আবার নতুন করে মাথাচাড়া দেয়-ইফতারে মুড়ির সঙ্গে জিলাপি মেশানো হবে কি হবে না। একদল ভোজনরসিকের মতে, পেঁয়াজু-বেগুনি-ছোলা-মুড়ির সঙ্গে জিলাপি মাখানো যেন স্বাদের পরম তৃপ্তি। অন্যদিকে, আরেক দল একে মনে করে ভয়ংকর ‘ফুড ক্রাইম’। তাদের মতে, ঝাল-নোনতা মুড়িতে মিষ্টি জিলাপি মাখানো মানেই স্বাদের ওপর আঘাত।
এই বিতর্কে কেউ মজা পায়, কেউ বিরক্ত হয়। তবে বাস্তবতা হলো-বছর ঘুরে রমজান এলেই ‘মুড়িতে জিলাপি’ নিয়ে এই আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ড হয়ে ফিরে আসে।
বাঙালির ইফতার মানেই এক বিশাল বাটিতে মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, শসা, টমেটো, ধনেপাতা কুচি, লেবু আর সরিষার তেল-সব একসঙ্গে মেখে বানানো এক ধরনের ‘ইফতার ককটেল’। অনেকের কাছে মুড়ি মাখানো নিজেই এক ধরনের শিল্প।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন কেউ সেই বাটিতে আস্ত কয়েকটা জিলাপি ভেঙে মিশিয়ে দেয়। কেউ এতে আনন্দ পায়, আবার কেউ হতভম্ব হয়ে বলে ওঠে-“আমার মুড়িতে জিলাপি কেন!” এখান থেকেই শুরু হয় ঝাল-মিষ্টির সেই চিরচেনা বিতর্ক, যা প্রতিবছর রমজান এলেই ফিরে আসে নতুন উদ্দীপনায়।
অনেকে মনে করেন, এই মিশ্রণ আধুনিক যুগের উদ্ভট আবিষ্কার। কিন্তু বাস্তবে জিলাপি-মুড়ির এই সম্পর্ক একেবারে নতুন নয়।
জিলাপি মূলত মুঘল আমলের খাবার হলেও, মুড়ির সঙ্গে জিলাপি মেখে খাওয়ার রেওয়াজ পুরান ঢাকার ইফতার সংস্কৃতি থেকে এসেছে বলে অনেকের ধারণা। বিশেষ করে চকবাজার এলাকায় ঘিয়ে ভাজা শাহী জিলাপি বহুদিন ধরেই ইফতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে জিলাপি মুড়ির সঙ্গে মেখে খাওয়ার চল কয়েক দশক পুরোনো। ভোজনরসিকদের একাংশের মতে, ছোলার ঝাল, লেবুর টক এবং মুড়ির নোনতা স্বাদের মধ্যে জিলাপির মিষ্টি যোগ হলে এক ধরনের ‘স্বাদের ভারসাম্য’ তৈরি হয়। তাদের ভাষায়, এটি অনেকটা টক-ঝাল-মিষ্টির একসঙ্গে মিশে যাওয়ার বিদেশি স্বাদের মতো।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় সরাসরি জিলাপি না মাখালেও ‘বুন্দিয়া’ দিয়ে মুড়ি খাওয়ার চল বহুদিনের। ফলে নোনতা-মিষ্টির মিশেল সেখানে খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।ডিজিটাল দুনিয়ায় ‘জিলাপি-মুড়ি যুদ্ধ’ আর মিম সংস্কৃতি
গত কয়েক বছর ধরে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে মুড়িতে জিলাপি মাখানোর বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের মিম, পোস্ট, রিলস এবং তর্ক-বিতর্ক দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৯-২০২০ সালের দিকে ফেসবুকে অদ্ভুত সব ইভেন্ট খোলার হিড়িক পড়ে।
একদিকে দেখা যায়, “ইফতারে মুড়িতে জিলাপি মাখানো বন্ধ চাই”-এমন ইভেন্ট। অন্যদিকে পালটা হিসেবে তৈরি হয়, “ইফতারে মুড়িতে জিলাপি মাখানো নিয়ে মারামারি চাই”-এমন হাস্যকর আয়োজন। এতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়, লাইক-কমেন্টে ‘বিভক্ত জাতি’ তৈরি হয়।
মিম পেজগুলো এটাকে “সিভিল ওয়ার” বা “গৃহযুদ্ধ” হিসেবে উপস্থাপন করে। কেউ জিলাপি-মুড়িকে ‘জগাখিচুড়ি’ বলে ট্রল করে, আবার কেউ এটাকে “ইফতারের সেরা আবিষ্কার” বলে গর্ব করে।
ফুড ব্লগাররা যখন পুরান ঢাকার ইফতারের রিভিউ করতে যান, তখন জিলাপি মাখিয়ে খাওয়ার দৃশ্যটি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। ফলে নতুন প্রজন্মের কেউ এটা খেয়ে প্রশংসা করে, আবার কেউ এটাকে ‘অখাদ্য’ বলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেয়।
কেন এই বিতর্ক এত জনপ্রিয়?
অনেকে মনে করেন, জিলাপি-মুড়ি বিতর্ক জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো এটি একটি “সেফ ডিবেট”। ধর্ম বা রাজনীতি নিয়ে তর্কে ঝুঁকি থাকে, কিন্তু খাবার নিয়ে তর্কে ঝুঁকি নেই-বরং আছে আনন্দ, হাসি আর মজা।
বাঙালির খাবার নিয়ে তর্ক করার স্বভাবও বহু পুরোনো। এই তালিকায় ঘুরেফিরে আসে-‘বিরিয়ানিতে আলু’, ‘শিঙাড়ায় বাদাম’, কিংবা ‘বাঙ্গি না তরমুজ’-এ ধরনের চিরচেনা বিতর্ক। তার সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে ‘মুড়িতে জিলাপি’।
পক্ষে-বিপক্ষে তরুণদের মতামত
মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মার্কেটিং বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নিয়ামুতুল ইসলাম শান্ত বলেন,
“মুড়ির সঙ্গে জিলাপি খাওয়ার মতো রুচিহীন ব্যাপার আর হয় না। মিষ্টি জিনিস মুড়ির সঙ্গে মেশানো মানে স্বাদের অপমান। ভাতের সঙ্গে কি কেউ চা মিশিয়ে খায়? মুড়ি ঝালের জন্য, মিষ্টির জন্য না।”
তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মুসফিরাত ওমর। তিনি বলেন,
“মুড়িতে জিলাপি দিলে মজা হয়। সব ধরনের স্বাদ পাওয়া যায়। যারা বিপক্ষে, তাদের আসলে টেস্টবাড নষ্ট-মজা বোঝে না।”
একই ধরনের মত দিয়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী আবু হেনা তাসমেরিও। তার ভাষ্য,
“মুড়িতে জিলাপি দিলে একটু বেশি ভালো লাগে। ঝালের সঙ্গে অন্যরকম একটা মজা পাওয়া যায়।”
ইফতারে ভাজাপোড়া আর জিলাপি: স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?
মুড়িতে জিলাপি মেশানো নিয়ে তর্ক যতই থাকুক, স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্নও সামনে আসে। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর তেলেভাজা খাবার ও অতিরিক্ত মিষ্টি অনেকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের আবাসিক চিকিৎসক ফেরদৌস রাসেল বলেন,
“ইফতারে তেলেভাজা খাবার ও মিষ্টি জিলাপি খাওয়া খুব একটা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। অনেক সময় এসব খাবার অস্বাস্থ্যকর তেলে ভাজা হয়, খোলা অবস্থায় বিক্রি হয়। এতে অ্যাসিডিটি, বদহজম, পেটে ব্যথাসহ নানা সমস্যা হতে পারে।” চিকিৎসকদের মতে, যাদের গ্যাস্ট্রিক, ডায়াবেটিস বা হজমের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ভাজাপোড়া ও মিষ্টি খাওয়ার বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা জরুরি।
শেষ কথা
ইফতারে মুড়িতে জিলাপি দেওয়া নিয়ে বিতর্কের শেষ সম্ভবত নেই। কারণ, এটি শুধু খাবারের প্রশ্ন নয়-এটি বাঙালির রুচি, ঐতিহ্য, অভ্যাস এবং মজার সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
কেউ মাখাবে, কেউ মাখাবে না-শেষ পর্যন্ত ইফতারের টেবিলে সবার জায়গা থাকুক, স্বাদের যুদ্ধটা থাকুক শুধু হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই।