বহিষ্কৃতদের ফেরার চেষ্টা, আপাতত দরজা খুলছে না বিএনপি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বহিষ্কারের মুখে পড়েছিলেন বিএনপির একাধিক নেতা। দলীয় হাইকমান্ডের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বারবার সতর্কবার্তাও তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তারা ধানের শীষ কিংবা বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর বিপক্ষে নির্বাচনে অংশ নেন। এর পরিণতিতে দ্রুতই আসে দলীয় শাস্তি-বহিষ্কারাদেশ।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। অধিকাংশ বিদ্রোহী প্রার্থী পরাজয়ের মুখ দেখেছেন। সেই সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশেও এসেছে মোহভঙ্গ। এখন বহিষ্কৃত সেই নেতারাই আবার দলে ফেরার পথ খুঁজছেন। নীরবে চলছে তৎপরতা, বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগও শুরু হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আপাতত বহিষ্কৃতদের ফেরানোর বিষয়ে কঠোর অবস্থানেই রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, দল চেয়েছিল বহিষ্কৃত নেতারা যেন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে না যান এবং ভোটের মাঠে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। কিন্তু তারা সেই প্রত্যাশা পূরণ করেননি। এখন তারা ফিরতে চাইছেন-এটা ইতিবাচক, তবে বিষয়টি কীভাবে দেখা হবে, সেটি সময়ই বলবে।
দলীয় সূত্র জানায়, বহিষ্কৃত নেতাদের কেউ কেউ ভুল স্বীকার করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জানান, সংসদ নির্বাচন শেষে দল পুনর্গঠনের প্রস্তুতি চলছে। এর আগেই বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নানা পথে দলে ফেরার চেষ্টা করছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তার ভাষায়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের দলে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তফসিল ঘোষণার পর দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ১১৭টি আসনে অন্তত ১৯০ জন বিএনপি নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরে দলের নির্দেশে অধিকাংশ নেতা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও একাধিক প্রভাবশালী নেতা শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটের মাঠে থাকেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের বহিষ্কার করে বিএনপি। শুধু তাই নয়, তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারা দেশে সহস্রাধিক নেতাকর্মীকেও বহিষ্কার করা হয়।
নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা ৭৮টি আসনের মধ্যে ২১টিতে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থীরা। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন মাত্র সাতটি আসনে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনের ফলাফলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসন হারায় বিএনপি। ঢাকা-১২, সিলেট-৫, নারায়ণগঞ্জ-৪সহ বিভিন্ন আসনে দল-সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সম্মিলিত ভোট সংখ্যা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বেশি হলেও বিভক্তির কারণে পরাজয় আসে।
এই ফলাফল বিদ্রোহী প্রার্থীদের রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। সাতজন ছাড়া প্রায় সবাই বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। অনেকেই বুঝতে পেরেছেন, দলীয় প্রতীক ছাড়া তাদের ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক অত্যন্ত সীমিত।
তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ বলছেন, শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোরতা জরুরি। আবার কেউ মনে করছেন, ভবিষ্যতের রাজনীতির স্বার্থে সমঝোতার দরজা খোলা রাখা উচিত।
ঢাকা-১৪ আসন থেকে পরাজিত বহিষ্কৃত নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু) যুগান্তরকে বলেন, তিনি আজীবন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দল যদি পুনর্বিবেচনা করে, তাহলে তিনি আবারও দলের জন্য কাজ করতে চান। তবে এখনো বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেননি বলে জানান তিনি।
নাটোর-১ আসন থেকে পরাজিত বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহ দপ্তর সম্পাদক (বহিষ্কৃত) তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, দল তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করলেও আদর্শিকভাবে তিনি বিএনপির সঙ্গেই আছেন। আগে পদে ছিলেন, এখন সমর্থক ও কর্মী হিসেবে কাজ করবেন। দল চাইলে ভবিষ্যতে তাকে কাজে লাগাতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব মিলিয়ে মাঠের পরাজয় ও দলে ফেরার অনিশ্চয়তা-দুই চাপে বিদ্রোহী নেতাদের রাজনীতি এখন দোলাচলে। আর বিএনপি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে-দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে আপস নয়, দল আগে, ব্যক্তি পরে।