করুণা নয়, চাই সুযোগ ও নাগরিক মর্যাদা
বাংলাদেশ বহু ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত বৈচিত্র্যের দেশ। এই বহুত্বই আমাদের শক্তি, আমাদের ইতিহাসের গভীরতা। অথচ এই বৈচিত্র্যের ভেতর এমন কিছু সম্প্রদায় আছে, যাদের অস্তিত্ব দৃশ্যমান হলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রায় অদৃশ্য। তেলেগু জনগোষ্ঠী তেমনই একটি সম্প্রদায়। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ভূখণ্ডে বসবাস, শ্রম ও জীবনযাপন করলেও রাষ্ট্রীয় আলোচনায় তাদের নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়।
ইতিহাস বলছে, তেলেগুদের সংগঠিত আগমন ঘটে ব্রিটিশ আমলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে চা-বাগান, রেলওয়ে ও পৌর পরিষেবায় শ্রমিক সংকট দেখা দিলে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী দক্ষিণ ভারত থেকে তেলেগুভাষী মানুষদের নিয়ে আসে। সে সময় দক্ষিণ ভারতে দুর্ভিক্ষ, ঋণজাল ও সামাজিক অস্থিরতা কৃষিজীবী মানুষকে অভিবাসনে বাধ্য করেছিল। দুবেলা খাবার, স্থায়ী কাজ ও সামান্য নিরাপত্তার আশায় বহু পরিবার অচেনা ভূখণ্ডে পাড়ি জমায়। তারা ভেবেছিল জীবন বদলাবে। বাস্তবে জীবন বদলেছে ঠিকই-কিন্তু সেই বদল এসেছে শ্রমের ভারে, মর্যাদার আলোয় নয়।
ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্নতার ইতিহাসে তেলেগুদের অবদান অবিচ্ছেদ্য। ১৮৬৪ সালে ঢাকা পৌর প্রশাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। নর্দমা পরিষ্কার, বর্জ্য অপসারণ, রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া-নগর ব্যবস্থাপনার এই মৌলিক কাজগুলোর বড় অংশই তাদের কাঁধে পড়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই পেশাই যেন তাদের উত্তরাধিকার হয়ে উঠেছে। আজও ঢাকার ধলপুর, টিকাটুলী, গোপীবাগ, শেরে বাংলা নগর, কল্যাণপুর, গাবতলী, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় তেলেগু পরিবারগুলোর বসতি রয়েছে। সিলেটের চা-বাগান ও পাবনার ঈশ্বরদী রেলওয়ে কলোনিতেও তাদের উপস্থিতি সুস্পষ্ট। শহর পরিষ্কার রাখা, রেলপথ সচল রাখা, চা উৎপাদন-দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে তাদের শ্রম নীরবে জড়িয়ে আছে।
কিন্তু যে সমাজ তাদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, সেই সমাজ কি তাদের মর্যাদা দিয়েছে? পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজকে আমরা প্রয়োজনীয় বলি, কিন্তু কর্মীকে সম্মান করি কতটা? তেলেগুদের পেশাগত পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক স্তরবিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পেশা বদলানো বা নতুন ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। একধরনের পেশাগত বৃত্ত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান-যা কেবল অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়, বরং সামাজিক কাঠামোরই প্রতিফলন।
ভাষা ও শিক্ষা এই প্রান্তিকতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তেলেগুরা ঘরে তেলেগু ভাষায় কথা বলে, কিন্তু বিদ্যালয়ে বাংলা বাধ্যতামূলক। ফলে শিশুরা শিক্ষাজীবনের শুরুতেই দ্বৈত ভাষাগত চাপে পড়ে। জাতীয় নীতিতে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কথা থাকলেও তেলেগুদের জন্য বাস্তব কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ভাষা শেখা শুধু পাঠ্যবই বোঝার বিষয় নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, প্রকাশ ও অংশগ্রহণের বিষয়। শিশু যদি নিজের ভাষায় ভাবতে ও অনুভব প্রকাশ করতে না পারে, তবে তার শিক্ষাজীবন শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফল হিসেবে ঝরে পড়ার হার বাড়ে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ সীমিত থাকে।
অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা নিম্নপদস্থ শ্রমিক পরিবারের আয় সীমিত। ফলে পরিবারের বড় সন্তানকে দ্রুত শ্রমবাজারে নামতে হয়। মেয়েদের শিক্ষাজীবনও হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। এই শিক্ষাগত ঘাটতিই আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত করে-একটি কঠিন চক্র তৈরি হয়, যা ভাঙা সহজ নয়।
সরকারি স্বীকৃতির অভাব এই প্রান্তিকতাকে কাঠামোগত রূপ দিয়েছে। তেলেগুরা গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নয়। ফলে কোটা সুবিধা, বিশেষ শিক্ষাসহায়তা বা নীতিগত সহায়তা থেকে তারা বঞ্চিত। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও তাদের জন্য কোনো আলাদা উদ্যোগ নেই। অথচ রাষ্ট্র স্বীকার করুক বা না করুক, তারা এই ভূখণ্ডেরই মানুষ-জন্মসূত্রে নাগরিক, শ্রমসূত্রে অবদানকারী। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কেবল প্রতীকী বিষয় নয়; এটি বাস্তব সুযোগের দরজা খুলে দেয়।
প্রান্তিকতা মানেই সংস্কৃতির বিলুপ্তি নয়। তেলেগু ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দ্রাবিড় ভাষা-প্রায় ৯ কোটি মানুষ এতে কথা বলে। ভাষাটির নিজস্ব লিপি, সাহিত্য ও ইতিহাস রয়েছে। প্রতি বছর ২৯ আগস্ট পালিত হয় তেলেগু ভাষা দিবস। বাংলাদেশে বসবাসকারী তেলেগুরা হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাচর্চার সুযোগ কম পায়, তবু পারিবারিক পরিসরে ভাষা টিকে আছে-গল্প, গান, প্রবাদে।
সংস্কৃতিতেও রয়েছে স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য। তেলেগু বিবাহরীতি আচারসমৃদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি। নারীদের শাড়ি পরার ভঙ্গি, অলংকারের ব্যবহার, মুগ্গু আঁকার ঐতিহ্য তাদের আলাদা পরিচয় বহন করে। লাঠিনাচ দলবদ্ধ পরিবেশনায় শক্তি ও ঐক্যের প্রকাশ ঘটায়। তেলেগু নববর্ষ ‘উগাদি’ উদযাপিত হয় বিশেষ খাবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে-উট্টুচারু, পংগাডালু, চিন্নুন্ডাল শুধু খাবার নয়, স্মৃতির অংশ। ধর্মীয় দিক থেকেও সম্প্রদায়টি বহুমাত্রিক-হিন্দু, খ্রিস্টান ও মুসলমান তেলেগুরা নিজ নিজ রীতি পালন করে।
সমাজ কাঠামোয় বর্ণভিত্তিক বিভাজনের প্রভাবও এখনো রয়েছে। কাপুলু, রেড্ডি, গল্লালু, চাকালী, মালা, মাদিগা, রেল্লী-গোত্রপরিচয় সামাজিক বাস্তবতার অংশ। পঞ্চায়েত প্রথাও বিদ্যমান। আনুমানিক আড়াই লাখের বেশি তেলেগু বাংলাদেশে বসবাস করলেও নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। এই পরিসংখ্যানহীনতাই একধরনের অদৃশ্যতা তৈরি করে। যে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা জানা নেই, তার জন্য নীতি নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে একটি নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে-যে জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শহর পরিচ্ছন্ন রেখেছে, নর্দমা পরিষ্কার করেছে, চা-বাগানে কাজ করেছে, রেলপথ সচল রেখেছে-রাষ্ট্র কি তাদের প্রতি যথেষ্ট দায়বদ্ধ? মৌলিক অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা কি তাদের প্রাপ্য নয়? উন্নয়নের গল্প, জিডিপি ও অবকাঠামোর সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নয়নের আলো সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনেও পৌঁছায়।
তেলেগু সম্প্রদায়ের জন্য এখন প্রয়োজন নীতিনির্ভর উদ্যোগ। প্রথমত, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা ও ভাষান্তর সহায়তা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও বিকল্প পেশায় প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। চতুর্থত, নির্ভরযোগ্য জনগণনা ও গবেষণা জরুরি-যাতে তাদের প্রকৃত সংখ্যা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থা জানা যায়। তথ্যভিত্তিক নীতিই হতে পারে টেকসই সমাধানের ভিত্তি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শ্রমকে সম্মান করা মানে শুধু পরিচ্ছন্ন শহর উপভোগ করা নয়; শ্রমিকের মর্যাদাও স্বীকার করা। তেলেগুরা সহানুভূতির বিষয় নয়-তারা অধিকারের দাবিদার নাগরিক। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন তার অগ্রগতির আলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনেও সমানভাবে পৌঁছাবে। তেলেগুরা এই দেশের ইতিহাসের অংশ, শ্রমের অংশ, সংস্কৃতির অংশ। এখন প্রয়োজন তাদের নাগরিক মর্যাদার পূর্ণ স্বীকৃতি। করুণা নয়-প্রয়োজন সুযোগ।
যোশেফ-ইউকে নন্দম জয়
সাধারণ সম্পাদক
তেলেগু কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি