পদ্মার ১৭ চরে নেই কোনো স্কুল, শিক্ষাবঞ্চিত হাজারো শিশু
নাটোরের লালপুর উপজেলার পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে বেড়ে উঠছে হাজারো শিশু-শিক্ষার আলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়ে। নদীর বুকে জেগে ওঠা এসব চরে নেই কোনো প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ফলে স্কুলের বয়স পেরিয়েও পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে না শিশু-কিশোরেরা।
সাত বছর বয়সী সাবিনা ইয়াসমিন থাকে পদ্মা নদী-পাড়ের এক চরে। তার দিন কাটে মায়ের কাজে সাহায্য আর খেলাধুলায়। স্কুলে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই-কারণ, তাদের চরে নেই কোনো স্কুল। দারিদ্র্য আর দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দূরের চরে গিয়ে পড়াশোনা করাও পরিবারের পক্ষে অসম্ভব।
সাবিনার মা জেসমিন খাতুন বলেন, সংসারের কাজের ফাঁকে মেয়েকে পড়তে বললেও বাস্তবতায় তা সম্ভব হয় না। বাবা ঝন্টু প্রামাণিক ইটভাটার শ্রমিক। প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দূরের স্কুলে শিশুকে আনা-নেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই তাদের।
স্কুলে যায় কি না-এমন প্রশ্নে সাবিনার চোখে ভর করে অভিমান। সে বলে, “আমাদের এখানে স্কুল নাই। বাবা গরিব, দূরে কোথাও পড়াতে পারে না। আমরা এখানে স্কুল চাই, পড়ালেখা করতে চাই।”
শুধু সাবিনা নয়, লালপুর উপজেলা-এর পদ্মা তীরবর্তী ১৭টি চরে বসবাসরত হাজারো শিশু একইভাবে শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
গত বছর ব্যক্তিগত উদ্যোগে রসূলপুর চরের সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে একটি স্কুল গড়ে তোলা হয়েছিল। উদ্যোক্তা ছিলেন ইটভাটা শ্রমিক ঝন্টু প্রামাণিক নিজেই। নিজের জমানো টাকায় বাঁশ, কাঠ ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি সেই স্কুলে ১৫-২০ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করত।
কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় স্কুলটি। বর্তমানে সেই জায়গা দখল করে রয়েছে প্রভাবশালীদের কোটি টাকার মহিষের বাথান। প্রাণভয়ে স্কুল পোড়ানোর ঘটনায় কেউ অভিযোগ না করায় তদন্তের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঝন্টু প্রামাণিক আক্ষেপ করে বলেন, “প্রথম রোজার দিন স্কুলটা পুড়িয়ে দিছে। ছেলেমেয়েদের কষ্ট দেখে আমি না খেয়ে স্কুলটা করছিলাম। চেয়ারম্যান, মেম্বার, ইউএনও যদি তখন উদ্যোগ নিত, এই অবস্থা হতো না।”
পোড়া স্কুলের জায়গায় এখনও পড়ে আছে ধ্বংসপ্রাপ্ত শহীদ মিনার-যা চরের মানুষের স্বপ্নভঙ্গের নীরব সাক্ষী।
যোগাযোগ সংকটে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থী
চরগুলো থেকে নিকটবর্তী সরকারি স্কুলের দূরত্ব পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার। বর্ষায় নৌকা ছাড়া যাতায়াত অসম্ভব, আর শুষ্ক মৌসুমেও বালুচর পেরিয়ে হাঁটা কষ্টসাধ্য। ফলে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না অধিকাংশ শিশুর।
চরবাসীরা বলছেন, পড়াশোনার সুযোগ না থাকায় শিশুরা অল্প বয়সেই কৃষিশ্রম, গৃহকাজ কিংবা অনানুষ্ঠানিক শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ আবার ধীরে ধীরে মাদক ও অপরাধের ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের একটাই দাবি-একটি স্কুল
চরের নারী-পুরুষ সবার কণ্ঠে একই দাবি-একটি স্কুল। সানজিদা খাতুন বলেন, “বাচ্চারা যদি পড়তে না পারে, বড় হয়ে আমাদের মতো কামলা খাটবে। এখানে একটা স্কুল খুব দরকার।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঠদান কেন্দ্র চালু ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসেনি।