পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য: জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ও পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতা
নবগঠিত বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় ৫০ জন সদস্য শপথ নিলেও একজনের নিয়োগ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে। তিনি সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, যিনি এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় দৈনিকগুলোতে তাঁর কয়েকটি বক্তব্য আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তিনি বলেছেন, নতুন সরকার সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির ধারায় ফিরে যেতে আগ্রহী। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’, যেখানে জাতীয় স্বার্থই হবে সব কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু।
এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে-জিয়াউর রহমানের (১৯৭৫–৮১) পররাষ্ট্রনীতি আসলে কী ছিল, এবং বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় তা কতটা প্রাসঙ্গিক?
জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শনকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা যায়- “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” এর আওতায় তিনি- ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নঘেঁষা নীতি থেকে সরে এসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেন। দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা জোরদারে সার্ক গঠনের উদ্যোগ নেন। কোনো পরাশক্তির বলয়ে না গিয়ে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নীতি অনুসরণ করেন। ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। সে সময় বিশ্ব ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক কাঠামোয় বিভক্ত। যুক্তরাষ্ট্র-ন্যাটো ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-ওয়ারশ জোটের বাইরে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন একটি কার্যকর তৃতীয় শক্তি হিসেবে কাজ করছিল। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতায় কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করেছিল।
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও নতুন চ্যালেঞ্জ
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব এককেন্দ্রিক থেকে ধীরে ধীরে বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। চীন আজ অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি, রাশিয়া সামরিকভাবে প্রভাবশালী, আর যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত অবস্থান জোরদার করছে। এই বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ায় সার্ক কার্যত অকার্যকর। ভারত-চীন সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ, আবার যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি গভীরভাবে চীনের সঙ্গে যুক্ত-শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ সেখান থেকেই আসে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শুভেচ্ছা বার্তা, উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সফরের আমন্ত্রণ ইঙ্গিত দেয়-দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্প ও কৌশলগত চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নবনির্বাচিত সরকারকে অভিনন্দন জানালেও তাঁর বার্তায় বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদ স্পষ্ট। বিশেষ করে আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তি নিয়ে চাপ বাংলাদেশের জন্য সংবেদনশীল ইস্যু। এসব চুক্তি ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাব কমানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
এখানেই প্রশ্ন-অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত অসম চুক্তিগুলো কি নতুন সরকারকে বহন করতে হবে?
তত্ত্ব ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব বিখ্যাত কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার বাস্তববাদ ও শক্তির ভারসাম্য তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার কাঠামো দ্বারা পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, জোসেফ নাই ‘সফট পাওয়ার’ ও ‘স্মার্ট পাওয়ার’-এর ধারণা দেন-যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক আকর্ষণ ও নৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য টেকসই পথ সম্ভবত এখানেই-হার্ড পাওয়ারের চাপ এড়িয়ে স্মার্ট পাওয়ার প্রয়োগ।
পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির দর্শন পুরোপুরি হুবহু প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে তার মূল দর্শন-ভারসাম্য, স্বার্থনির্ভরতা ও বহুমুখী সম্পর্ক-আজও প্রাসঙ্গিক। নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কোনো পরাশক্তির বলয়ে আটকে না পড়ে কৌশলগত ভারসাম্যের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে বাস্তব রূপ দেওয়া।
সংঘাত নয়, বরং কূটনৈতিক দক্ষতা, সমতা ও পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।