জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান কত দূর যেতে পারবেন?
দেশে আপাতত একটি স্বস্তির বিরতি চলছে। ক্ষমতার বাইরে গেছে দীর্ঘদিনের সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থারও অবসান হয়েছে, আর একটি তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। প্রকৃতিতেও যেন মিলেছে তার প্রতিফলন-বসন্ত, সামনে ঈদ, বৈশাখ ও বৈসাবির উৎসবমুখর সময়। দীর্ঘদিন পর প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।
তবে এই স্বস্তি কতটা টেকসই-সে প্রশ্নের জবাব এখনো অনিশ্চিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আশাভঙ্গ নতুন নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত দুজন রাজনৈতিক নেতার ভূমিকার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। একজন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আর অন্যজন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
নির্বাচনের ফলাফল ও ‘ভূমিধস’ বিতর্ক
সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির জয়কে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম প্রায় সর্বসম্মতভাবে ‘ভূমিধস বিজয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ী শ্রেণির মধ্যে স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই নির্বাচনে আরেকটি রাজনৈতিক স্রোত চোখ এড়ানোর নয়-তা হলো জামায়াতে ইসলামীর উত্থান। সংখ্যার বিচারে জামায়াত সরাসরি সরকার গঠনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়নি। কিন্তু অতীতের তুলনায় তাদের আসন ও ভোট-উভয় ক্ষেত্রেই যে অভাবনীয় বৃদ্ধি ঘটেছে, তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে যেখানে দলটি সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল, সেখানে এবারে পেয়েছে ৬৮টি। ভোটের হিসাবেও অনুমান করা হচ্ছে, তাদের পক্ষে পড়েছে দুই কোটিরও বেশি ভোট-যা আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
এটি কি ‘ভূমিধস’? প্রচলিত অর্থে নয়। কিন্তু সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকে এই ফলাফল নিঃসন্দেহে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
আদর্শ থেকে বাস্তবতায় অভিযোজন
জামায়াতের আদর্শিক ভিত্তি মওলানা মওদুদীর চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত-যেখানে পুঁজিবাদবিরোধিতা ও পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরোধিতা ছিল স্পষ্ট। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকের সমাজ ও অর্থনীতি পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত। জামায়াতের কর্মী, সমর্থক এমনকি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করছে।
ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি এই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খুঁজেছে। নির্বাচনপূর্ব নীতি-আলোচনা ও ইশতেহারে বাজার অর্থনীতির বাস্তবতা মেনে নিয়ে ‘সুশাসন’ ও ‘স্থিতিশীলতা’র কথা বলেছে জামায়াত। এটি দলটির আদর্শিক বিবর্তনের একটি বড় ধাপ।
নারী ও সংখ্যালঘু প্রশ্নে নীরব সংস্কার
নারী নেতৃত্ব ও সংখ্যালঘু অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। তবে বাস্তবতা হলো, ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে নারী সদস্য ও নারী কর্মীদের সক্রিয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। এবারের নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে নারী কর্মীদের উপস্থিতি বিএনপির জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যন্ত নারীদের বড় মিছিল ও সমাবেশ জামায়াতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন দৃশ্য। এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নারী সংসদ সদস্য তৈরির বিষয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্য-‘আমরা তাদের প্রস্তুত করছি’-ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক বাস্তববাদ
ডা. শফিকের নেতৃত্বে জামায়াত আন্তর্জাতিক যোগাযোগেও বাস্তববাদী কৌশল নিয়েছে। বিদেশে থাকা সাবেক কর্মীদের দেশে এনে নির্বাচনী কাজে যুক্ত করা হয়েছে। ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি এখন আর শুধু ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা।এতে বোঝা যায়, দলটি ‘ইসলামি বিপ্লব’-এর ভাষা থেকে সরে এসে ক্ষমতার বাস্তব ব্যবস্থাপনার দিকে ঝুঁকছে। সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত এক দশকে আদর্শিক সংস্কার ও রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি বড় ধাপ অতিক্রম করেছে। তবে সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বিএনপির নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক। খালেদা জিয়ার সময়কার বোঝাপড়া এখন আর নেই। উভয় দলে নতুন প্রজন্ম ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব সামনে এসেছে। এই সম্পর্ক সহযোগিতার হবে, না সংঘাতের-তা নির্ধারণ করবে ডা. শফিকের সংস্কারবাদী রাজনীতির ভবিষ্যৎ সীমা।
আলতাফ পারভেজ গবেষক ও লেখক
*মতামত লেখকের নিজস্ব