ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি শেষ হলো ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যায়। ক্যালেন্ডারে সময়টা দেড় বছর হলেও, মব সহিংসতার শিকার নাগরিকদের কাছে এই সময় যে কত দীর্ঘ ও ভয়াবহ ছিল-তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের চরম সংকটময় মুহূর্তে গঠিত এই সরকারের প্রতি জনমানুষের প্রত্যাশা ছিল পাহাড়সম। সংস্কার, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে স্বাভাবিক ধারায় ফেরানোর কথা ছিল এই সরকারের মূল অঙ্গীকার। বিদায়ী সরকার বিভিন্ন সাফল্যের দাবি করলেও বাস্তবতায় জনপ্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র-অনেক ক্ষেত্রে হতাশাজনক। এই লেখায় তথ্য-উপাত্ত ও ঘটনাপ্রবাহের আলোকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনকাল সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
১. আইনশৃঙ্খলা ও মব সহিংসতা
দায়িত্ব গ্রহণের সময়ই দেশ ভয়াবহ আইনশৃঙ্খলা সংকটে ছিল। কিন্তু দেড় বছরেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং মব সহিংসতা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, এই সময়ে শত শত মানুষ মবের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার এবং নদীতে মরদেহ ভেসে ওঠার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছায়। তবে নির্বাচন দিবসে বড় ধরনের সহিংসতা এড়াতে পারায় সরকার এই একটি ক্ষেত্রে স্বীকৃতি পেতে পারে।
২. দীপু দাস হত্যা: সরকারের বিবেকের পরীক্ষা
ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাসকে প্রকাশ্যে হত্যা ও পরে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা মব সহিংসতার ভয়াবহতার চরম উদাহরণ। একই ধরনের নৃশংসতা শরীয়তপুর ও চট্টগ্রামেও দেখা গেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার সংখ্যা এই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীপু দাস হত্যাকাণ্ড ইউনূস সরকারের শাসনামলের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে।
৩. কূটনীতি: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘বড় খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচয়ের দাবি থাকলেও দৃশ্যমান কূটনৈতিক সাফল্য সীমিত। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয়নি, বরং নতুন করে শরণার্থী প্রবেশ বেড়েছে। বিভিন্ন দেশের ভিসা নীতিতে বাংলাদেশিদের জন্য কঠোরতা এসেছে, পাসপোর্টের মান কমেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞাও আরোপ হয়েছে।
৪. উন্নয়নহীন সময় ও আঞ্চলিক পক্ষপাত
১৮ মাসে নেওয়া নতুন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বড় অংশ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত ছিল। বিপরীতে বহু জেলা কোনো প্রকল্পই পায়নি-যা আঞ্চলিক বৈষম্যের অভিযোগকে জোরালো করেছে।
৫. স্বজনপ্রীতি ও স্বার্থের সংঘাত
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই স্বজনপ্রীতি ও কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়োগ সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
৬. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট
নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন যুক্ত হয়নি, গ্যাস সংকট বেড়েছে। এলপিজি সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
৭. নারীদের নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্ব
নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ও নারীবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরকার কার্যকর অবস্থান নেয়নি। সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নেমে এসেছে ঐতিহাসিকভাবে নিম্নস্তরে।
৮. অন্তর্ভুক্তির বদলে বিভাজন
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পরিবর্তে দেশ রাজনৈতিকভাবে আরও বিভক্ত হয়েছে। একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া এবং ব্যাপক গ্রেপ্তার পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে।
৯. রিজার্ভ ও আর্থিক শৃঙ্খলা: ইতিবাচক দিক
রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রিজার্ভের কিছুটা উন্নতি ও ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রচেষ্টা সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
১০. ঋণের পাহাড়
সরকারি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায়। দৃশ্যমান উন্নয়ন ছাড়া ঋণ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
১১. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে। শিল্পখাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
১২. শিক্ষা ব্যবস্থা ও ক্যাম্পাস রাজনীতি
রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা, পাঠ্যবই সংকট ও মানহীনতার অভিযোগ রয়েছে।
১৩. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা
সংবাদমাধ্যম স্বাধীন বললেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ ও চাপের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সাংবাদিক কারাবন্দি, কিছু গণমাধ্যমে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
১৪. মত প্রকাশ: আংশিক স্বস্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় মত প্রকাশ তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও সমালোচনার কারণে চাকরি হারানো ও মামলার ঘটনাও ঘটেছে।
১৫. মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় স্মৃতি
মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মানজনক ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারে না। একাত্তর ও সাম্প্রতিক আন্দোলনকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা সমাজে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন: ১০-এ ৩
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত সাফল্য ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও শাসক হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস অধিকাংশ সূচকে প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য আমার মূল্যায়ন-১০–এ ৩।