ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে এই আন্দোলন একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং ছাত্র-জনতা, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ চলাকালে বিরোধী দলের সদস্যরা হট্টগোল করেন। পরে রাষ্ট্রপতি বক্তব্য শুরু করলে তারা ওয়াকআউট করেন।
রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন দেশের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তিনি অভিনন্দন জানান।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচেষ্টার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ এবং জনগণের সক্রিয় উপস্থিতি গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করেছে। বর্তমান সংসদে বিএনপি ও সমমনা জোটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় লাভের কথাও তিনি উল্লেখ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানান।
রাষ্ট্রপতি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের স্মরণ করেন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অবদানও স্মরণ করেন তিনি। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।
তার ভাষণে তিনি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতির তথ্য অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ আহত বা পঙ্গু হন। এছাড়া কয়েকশ মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারান।
আহতদের চিকিৎসা সহায়তার বিষয়েও তিনি কথা বলেন। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা চলছে এবং গুরুতর আহত ১৩৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি মানুষকে স্বাস্থ্য কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং তাদের চিকিৎসা সহায়তা অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রদান করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ, বিভিন্ন জেলায় স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন, শহীদদের কবর সংরক্ষণ এবং শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন। ওসমানী উদ্যানে “জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ” নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার।
তিনি আরও বলেন, মুদ্রাস্ফীতি এখনও চ্যালেঞ্জ হলেও তা ধীরে ধীরে কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যেখানে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, তা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কমে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে নেমেছে। রপ্তানি খাত নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গত এক বছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। পাশাপাশি নতুন রপ্তানি খাত ও বাজার সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।