রাজধানীর পরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দীর্ঘদিন ধরেই সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত। এবার সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অপেক্ষাকৃত নিম্ন গ্রেডের চাকরিতে থেকে তারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজউকের অন্তত দেড় ডজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে। অভিযোগের তালিকায় আছেন ইমারত পরিদর্শক, নকশাকার, কম্পিউটার অপারেটর, বেঞ্চ সহকারী, রেকর্ড কিপার থেকে শুরু করে সহকারী অথরাইজড অফিসার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা। তাদের বিরুদ্ধে নকশা জালিয়াতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অর্থ আদায়, নোটিশের ভয় দেখিয়ে ঘুষ নেওয়া এবং সেবা প্রদানে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে তাদের মধ্যে আছেন-ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান, নকশাকার শফিউল্লাহ বাবু, সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর জাফর সাদেক, ইমারত পরিদর্শক আমীর খসরু, ইমারত পরিদর্শক মো. তারিফুর রহমান, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিন, নকশাকার এমদাদ আলী, সুপারভাইজার খালেদ মোশাররফ তালুকদার, সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, বেঞ্চ সহকারী বাসার শরীফ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ইউসুফ মিয়া, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর বেলাল হোসেন চৌধুরী রিপন, উচ্চমান সহকারী মোহাম্মদ হাসান এবং রেকর্ড কিপার মো. ফিরোজ।
ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারণা পাকিস্তান আমলে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। পরে ১৯৮৭ সালে রাজউক প্রতিষ্ঠার পর সংস্থাটির পরিধি আরও বাড়ে। বর্তমানে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, ভবনের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নগর অবকাঠামো উন্নয়ন—সবকিছুতেই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে রাজউক। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থাটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ জমে আছে।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তুলনামূলক নিম্ন বেতনের পদে কর্মরত থেকেও কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। অনেকের চাকরির মেয়াদ ৫ থেকে ৭ বছরের বেশি নয়, কিন্তু তাদের সম্পদের পরিমাণ সেই আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তার ভাষ্য, কয়েকটি অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে; তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়লেই পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকের জনসংযোগ শাখার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক যাচাইয়ে কয়েকজনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের ইঙ্গিত পাওয়ার পরই প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু হয়। সেই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মামলা ও পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
অনুসন্ধানে আলোচিত কর্মকর্তাদের একজন ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান। অভিযোগ রয়েছে, ভবন মালিকদের নোটিশ দেখিয়ে বা নোটিশের ভয় দেখিয়ে তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করতেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিলে পরবর্তী হয়রানি থেকে অব্যাহতির আশ্বাস দিতেন, আর টাকা না দিলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয় দেখানো হতো। তার বিরুদ্ধে রাজউক নিজেও তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মনিরুজ্জামানের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, গাজীপুর ও পটুয়াখালীতে জমি, বরিশালে স্ত্রীর নামে জমি এবং আরও বিভিন্ন আর্থিক বিনিয়োগ রয়েছে। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা বলে আর বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রাজউকের আরেক আলোচিত কর্মকর্তা নকশাকার শফিউল্লাহ বাবুর বিরুদ্ধে রয়েছে নকশা জালিয়াতি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে নথি অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একাধিক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের হয়ে ব্রোকারের ভূমিকাও পালন করতেন। অতীতে একটি নকশা জালিয়াতি মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ আছে।
শফিউল্লাহ বাবুর সম্পদের তালিকায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, নিজ নামে বহুতল বাড়ি, রাজউকের বিভিন্ন প্রকল্পে প্লট এবং পরিবারের সদস্যদের নামে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগ। তার স্ত্রী, শ্বশুর ও ভাইয়ের নামেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত এক দশকে তিনি একাধিকবার বিদেশ সফর করেছেন।
কম্পিউটার অপারেটর জাফর সাদেকের বিরুদ্ধেও নকশা পাস এবং প্লটসংক্রান্ত অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে। সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীর একাধিক এলাকায় তার বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। নব্বইয়ের দশকে রাজউকে যোগ দেওয়া ইমারত পরিদর্শক আমীর খসরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও বিস্তৃত। তার নিজের, স্ত্রীর বা আত্মীয়স্বজনের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ভবন, বহু ফ্ল্যাট ও মূল্যবান প্লট থাকার তথ্য দুদকের হাতে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ইমারত পরিদর্শক তারিফুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে তিনি অননুমোদিত নির্মাণের ক্ষেত্রে নীরব থেকেছেন এবং ভবন মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত অবৈধ অর্থ আদায় করেছেন। এ বিষয়ে তারিফুর রহমান দাবি করেছেন, তার সব সম্পদের হিসাব কর কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে এবং দুদক তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করবে। ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিনের বিরুদ্ধেও রাজধানীতে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট এবং সাভারে জমি ও ভাড়াবাড়ি থাকার তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে। একইভাবে নকশাকার এমদাদ আলী, সুপারভাইজার খালেদ মোশাররফ তালুকদার, সহকারী অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন, বেঞ্চ সহকারী বাসার শরীফ, ইউসুফ মিয়া, রিপন, হাসান ও ফিরোজের বিরুদ্ধেও নিজ নিজ সামর্থ্যের তুলনায় অস্বাভাবিক সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।
সহকারী অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও গুরুতর। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নকশাবিহীন ভবন অনুমোদন, ভবন মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং ‘উচ্ছেদ’ বা ‘সংযোগ বিচ্ছিন্ন’ করার হুমকি দিয়ে ঘুষ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানী ও জেলার বাইরে জমি, বহুতল ভবন এবং গাড়ির তথ্য অনুসন্ধানকারীদের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে। অবশ্য এ বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ থাকলে দুদক সেটি দেখবে।
রাজউকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বহু বছর ধরে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অনিয়ম ও ঘুষের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানটিতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) এ বি এম এহছানুল মামুন বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দুদক যদি অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পায়, তবে তারাও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজউক দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তার মতে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের পাশাপাশি যারা এসব অনিয়মে সহায়তা করেছে, সুরক্ষা দিয়েছে বা সুবিধা করে দিয়েছে—তাদেরও চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। না হলে শুধু কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনায় রাজউকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সংস্থাটিতে দুর্নীতি, নকশা জালিয়াতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতিই ডেকে আনে না, বরং নগর পরিকল্পনা, আবাসন শৃঙ্খলা এবং সাধারণ মানুষের সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়। তাই চলমান অনুসন্ধান নিরপেক্ষভাবে শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে নানা মহল থেকে।