মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়ায় দেশের সমুদ্রগামী মৎস্য খাতেও সংকট দেখা দিয়েছে। ডিজেল সরবরাহে ঘাটতির কারণে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন মৎস্যবন্দরে শত শত মাছ ধরা ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলে, ট্রলারমালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
জেলেদের অভিযোগ, জ্বালানির বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিছু ব্যবসায়ী ডিজেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এর ফলে বরগুনা, পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর আলীপুর ও মহিপুর, ভোলার লালমোহন ও মনপুরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন মৎস্যবন্দর ও অবতরণকেন্দ্রে ট্রলারগুলো ঘাটেই পড়ে আছে।
বরগুনার পাথরঘাটায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বড় মৎস্যবন্দর বাংলাদেশ ফিশারিজ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএফডিসি) ঘাটের জেলে ও ট্রলারমালিকেরা জানান, সেখানে তিন শতাধিক ট্রলার কয়েক দিন ধরে ডিজেল না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছে না। ফলে বন্দরটির স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সামনে ঈদ-উল-ফিতর ঘনিয়ে আসায় জেলেদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী এবং জেলা মৎস্যজীবী ফিশিং ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দুলাল হোসেন বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মৎস্য ব্যবসায়ী মাসুম আকন বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার গুজব ছড়িয়ে কিছু ব্যবসায়ী ডিজেল মজুত করে রেখেছেন। কেউ কেউ আবার গোপনে বাড়তি দামে তেল বিক্রি করছেন। ফলে অধিকাংশ ট্রলার মালিক তাদের ট্রলার বিভিন্ন খালে নোঙর করে রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয় এক মৎস্য ব্যবসায়ী জাকির বিশ্বাস জানান, বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিজেল না থাকলেও অতিরিক্ত টাকা দিলে গোপনে তেল পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, লিটারে প্রায় ২০ টাকা বেশি না দিলে অনেক ক্ষেত্রে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। একজন ট্রলার মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়েক দিন ধরে ঘাটে অপেক্ষা করেও তারা ডিজেল পাচ্ছেন না। অথচ গোপনে কিছু ট্রলার বাড়তি দামে তেল সংগ্রহ করে সাগরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত তেল থাকার পরও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তা মজুত করে রেখেছেন। এতে সমুদ্রগামী ট্রলারগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে ঘাটেই অলস সময় কাটাচ্ছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জেলেরা বলছেন, এই সংকটে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। পাথরঘাটার এক জেলে জাফর হাওলাদার বলেন, ঈদের আগে পরিবারের জন্য কিছু অর্থ উপার্জনের আশা ছিল। কিন্তু ট্রলার সাগরে যেতে না পারায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
এদিকে জ্বালানি ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। পাথরঘাটার তেল ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ গাজী বলেন, সরকারি ডিলারের বাইরে অনেক লাইসেন্সবিহীন ব্যবসায়ী বাজারে তেল সরবরাহে প্রভাব ফেলছেন। এতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। আরেক ব্যবসায়ী ফারুক হাওলাদার জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কোটাভিত্তিক তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। পাথরঘাটায় সাপ্তাহিক চাহিদা প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ লিটার হলেও বর্তমানে সরবরাহ অনেক কম। ফলে বড় পরিমাণে ডিজেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
শুধু পাথরঘাটা নয়, পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন মৎস্যবন্দরেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। ট্রলার মালিকরা বলছেন, একটি ট্রলার সাগরে যেতে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক শ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া সম্ভব নয়। ভোলার মনপুরার ট্রলার মালিক নাসির উদ্দিন বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি সংকটের কথা জানানো হচ্ছে। এতে তাদের ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, যদি কোনো অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসন বিষয়টি নজরদারিতে রেখেছে বলেও তিনি জানান।