জাতীয় সংসদ কার্যকর না থাকার সময়ে জারি করা অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অন্তত ২০টি বাতিলের মুখে পড়তে পারে। এসব অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে অনুমোদন পাবে কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করার সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে জারি করা এসব অধ্যাদেশের মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশ-সহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু অধ্যাদেশ রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আইনগত ও সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছে।
তিন শ্রেণিতে ভাগ করে পর্যালোচনা
সংসদীয় কমিটি সূত্র জানায়, অধ্যাদেশগুলো তিনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রথমত, যেগুলো অপরিবর্তিত রেখে বিল আকারে পাস করা হবে। দ্বিতীয়ত, যেগুলো সংশোধন করে সংসদে তোলা হবে। তৃতীয়ত, যেগুলোতে ঐকমত্য না হওয়ায় চলতি অধিবেশনেই বাতিলের সুপারিশ করা হচ্ছে। কমিটির সদস্যদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাড়াহুড়ো করে অনেক অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যার ফলে বেশ কিছু অধ্যাদেশে ত্রুটি ও অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে।
গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে আইনি প্রশ্ন
গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫ ইতোমধ্যে আইনি বিতর্কের মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করায় সরকারও আপাতত এটি পাসের বিষয়ে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। যদিও বিরোধী রাজনৈতিক মহল থেকে এ নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে।
বিচার বিভাগ ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ নিয়েও আপত্তি উঠেছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা এককভাবে প্রধান বিচারপতির হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাবকে কেউ কেউ বিতর্কিত হিসেবে দেখছেন। একইভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, বেসামরিক বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন খাত সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশও বাতিলের তালিকায় রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী সময়সীমা
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, অধ্যাদেশ কার্যকর রাখতে হলে সংসদের প্রথম বৈঠকে তা উত্থাপন এবং ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন নিতে হয়। অন্যথায় সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। ওই দিন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করেন। পরে সেগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়, যাদের ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে অনুমোদন না পেলে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাবে।
কমিটির অবস্থান
বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, যেসব অধ্যাদেশের বিষয়ে ঐকমত্য হবে না, সেগুলো বাতিলের সুপারিশ করা হবে। প্রয়োজনে পরবর্তীতে নতুন করে বিল আকারে সংসদে তোলা হতে পারে। কমিটির বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা অংশ নিয়েছেন। বৈঠকে ২৬টি অধ্যাদেশ আলোচনা হয়, যার মধ্যে ২০টি বাতিলের তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
অধ্যাদেশ জারির পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব পালনের ৫৫৯ দিনে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেন। নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, রাজস্ব, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে এসব অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়।