জ্বালানি সংকটে থমকে গেছে দেশের নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য খাত। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর এলাকার জেলে রণজিৎ চন্দ্র দাসের মতো হাজারো জেলে এখন নৌকা ঘাটে বেঁধে বসে আছেন। নদী, জাল ও ইঞ্জিন থাকলেও ডিজেলের অভাবে জীবিকা যেন বন্ধ হয়ে গেছে তাদের। রণজিৎ বলেন, স্থানীয় হাটবাজারে ডিজেল মিলছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও লিটারপ্রতি অতিরিক্ত ৬০ থেকে ৭০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, যা দিয়ে মাছ ধরে খরচ তোলা সম্ভব নয়। সাত দিন ধরে নৌকা বন্ধ থাকায় পরিবার ও শ্রমিকদের নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন তিনি। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ সংকট শুধু একটি এলাকার নয়; দেশের প্রায় সব নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে একই চিত্র। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দেশের মৎস্য খাতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ডিজেলের অভাবে নৌকা ও ট্রলার নদী কিংবা সাগরে যেতে পারছে না। মৎস্যজীবীরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মাছ ধরা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে নদ-নদীতে মাছ আহরণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব পড়েছে মৎস্যবন্দর ও মোকামগুলোতেও, যেখানে অনেক স্থানে কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
এতে শুধু জেলেরা নয়; আড়তদার, পাইকার, শ্রমিক, বরফকল মালিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরাও বিপাকে পড়েছেন। পুরো মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি এখন চাপের মুখে। এই খাতের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এরই মধ্যে সামনে আসছে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। জ্বালানি সংকটে কাজ বন্ধ থাকার পর এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা জেলেদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সমুদ্রগামী ট্রলার পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি, খাদ্য, বরফ ও শ্রমিকদের মজুরি—সব মিলিয়ে খরচ এত বেড়েছে যে মাছ বিক্রি করে সেই ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে প্রায় ১৪৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয় বলে জানিয়েছেন জেলেরা। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যে জানা যায়, দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখের বেশি। পরিবারসহ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ। প্রতিদিন হাজার হাজার নৌকা ও ট্রলার পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ ডিজেলের প্রয়োজন হয়, যা বর্তমানে সরবরাহ সংকটে পড়েছে।
উপকূলজুড়ে এখন একই দৃশ্য—ঘাটে সারি সারি নৌকা, খালে নোঙর করে থাকা ট্রলার এবং কর্মহীন জেলেদের অপেক্ষা। খুলনা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জেলেরা তেল না পেয়ে বসে আছেন।পটুয়াখালীর মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরে শত শত ট্রলার ঘাটে আটকে আছে। দৈনিক চাহিদার তুলনায় অল্প পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ হওয়ায় অধিকাংশ ট্রলার সমুদ্রে যেতে পারছে না। এতে মাছ সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের কাজও থমকে গেছে।
বরগুনার বদরখালী এলাকায় জেলেরা জ্বালানি সংকটের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত মূল্যে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না, বরং বেশি দাম দিলেই পাওয়া যাচ্ছে। ছোট নৌকার জেলেরা বোতলে তেল না পাওয়ায় আরও বিপাকে পড়েছেন। কুড়িগ্রামের চিলমারীতেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। ডিজেল সংকট ও অতিরিক্ত দামের প্রতিবাদে জেলেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি না দিলে তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, ঈদের পর কিছু এলাকায় ডিজেল সংকটের তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট, ব্যয় বৃদ্ধি ও আসন্ন নিষেধাজ্ঞা—এই তিন চাপে দেশের মৎস্য খাত এখন কঠিন সময় পার করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।