যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই যে হারে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঋণের এ উল্লম্ফন ঘটে। বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বাজেট ঘাটতি বাড়ছে দ্রুত
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি আরও এক ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে। প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে শুধু ফেব্রুয়ারিতেই ঋণ নেওয়া হয়েছে ৩০৮ বিলিয়ন ডলার
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।
কেন বাড়ছে ঋণ?
অর্থনীতিবিদদের মতে, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে-
যুদ্ধ ব্যয় বৃদ্ধি কর কমানো প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত খরচ এসব নীতিগত অগ্রাধিকার একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় ঋণের চাপ আরও বাড়ছে।
সুদের বোঝাও বাড়ছে
২০২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
অতিরিক্ত সুদ ব্যয়: প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার
মোট সুদ পরিশোধ: ৪৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি
অর্থাৎ, শুধু ঋণের সুদই এখন বড় অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে? মাত্র পাঁচ মাস আগেও যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ছিল ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে
আসন্ন নির্বাচনের আগেই তা ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।
হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট জানিয়েছেন, ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক তৎপরতায় ইতোমধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস সতর্ক করে বলেছে-
এই ঋণের চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে।
বাড়ছে গৃহঋণের সুদ গাড়ির ঋণ ব্যয় বাড়ছে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে
মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি হচ্ছে পাশাপাশি পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
পিটার জি পিটারসন ফাউন্ডেশনের সিইও মাইকেল পিটারসন বলেন, বর্তমান ঋণ বৃদ্ধির হার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় বোঝা তৈরি করছে। কমিটি ফর অ্যা রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগুইনাসের মতে,
চলতি বছরেই ঋণের সুদ এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে
২০৩৬ সালের মধ্যে তা দুই ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে
ফেড চেয়ারম্যানের সতর্কতা
জেরোম পাওয়েল বলেন, বর্তমান ঋণের গতিপথ উদ্বেগজনক।
তার ভাষ্যে “এই ঋণ এখনই বিপজ্জনক না হলেও ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ”
তিনি আরও বলেন, অর্থনীতি যদি ঋণের চেয়ে দ্রুত না বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।
সরকারি হিসাব কী বলছে?
মার্কিন ট্রেজারির তথ্য অনুযায়ী-
মোট ব্যয়: ৭.০১ ট্রিলিয়ন ডলার
মোট আয়: ৫.২৩ ট্রিলিয়ন ডলার
ঘাটতি: ১.৭৮ ট্রিলিয়ন ডলার
এই বড় ঘাটতিই ঋণ বাড়ার প্রধান কারণ।
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ কমাতে হলে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে—
রাজস্ব বৃদ্ধি সামাজিক খাতে ব্যয় কমানো প্রবৃদ্ধি বাড়ানো তবে এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে কঠিন হওয়ায় দ্রুত সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
উপসংহার
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ জিডিপির প্রায় ১০১ শতাংশ, যা ২০৩৬ সালের মধ্যে ১২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সর্বোচ্চ রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন আর্থিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।