সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত, উপস্থিতি বৃদ্ধি ও ঝরে পড়া রোধে চালু হওয়া বহুল প্রত্যাশিত মিড ডে মিল কর্মসূচিতে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের পাতে পরিবেশন করা হচ্ছে পচা বা অপরিপক্ব কলা, নষ্ট ডিম, ফাঙ্গাসযুক্ত রুটি এবং নিম্নমানের খাবার। এতে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্ধারিত মেনু অনুসরণ না করে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে ইচ্ছেমতো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ঠিকাদারদের গাফিলতি ও তদারকির অভাবে সরকারের ভালো উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত বছরের ১৫ নভেম্বর নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় শুরু হয় এই কর্মসূচি। বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল কার্যক্রম চলছে, যার আওতায় রয়েছে প্রায় ৩১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী।
দেশের অন্তত ২৫টি উপজেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়েই নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। কোথাও পচা কলা, কোথাও ফাঙ্গাসযুক্ত রুটি, আবার কোথাও নষ্ট বা কাঁচা ডিম বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত খাবার শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না। হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় ১০৪টি বিদ্যালয়ে ডিম ও রুটি সরবরাহের কথা থাকলেও অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা কিছুই পায়নি। কোথাও শুধুমাত্র ডিম দিয়ে দায়সারা হয়েছে, তাও নষ্ট বা ভাঙা অবস্থায়।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও স্বরূপকাঠিতে ডিমের ওজন কম থাকার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের মতে, সরবরাহ করা ডিমের একটি বড় অংশ নির্ধারিত ওজনের চেয়ে ছোট। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে অনেক বিদ্যালয়ে সিদ্ধ ডিমের পরিবর্তে কাঁচা ডিম দেওয়া হয়েছে, আবার কোনো কোনো দিন খাবারই দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে খাবার দেরিতে পৌঁছানো এবং সংরক্ষণে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্ধারিত দুধের পরিবর্তে শুধু রুটি বিতরণ করা হয়েছে। আবার পরদিন সরবরাহ করা কলার বড় অংশই পচা ও অপরিপক্ব হওয়ায় ফেরত পাঠাতে হয়েছে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, চাঁদপুর সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও শুধু বিস্কুট দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও সেটিও দেওয়া হচ্ছে না।
অসুস্থতার অভিযোগ
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এক শিক্ষার্থী রুটি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অভিভাবকের অভিযোগ, রুটিটি ছিল পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত। নেত্রকোনার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক জানান, সরবরাহ করা খাবার খেয়ে অনেক শিক্ষার্থী বমি করেছে এবং অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের তৎপরতা ও তদন্ত
মুন্সীগঞ্জে নিম্নমানের খাবার বিতরণের অভিযোগ ওঠার পর জেলা প্রশাসক নিজেই তদন্তে নামেন এবং তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শুরুতে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা ছিল, তবে তা দ্রুত ঠিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের সতর্ক করেছেন এবং সময়মতো মানসম্মত খাবার সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন।
মেনু ও বাস্তবতার অসামঞ্জস্য
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্ধারিত মেনু অনুযায়ী সপ্তাহে বিভিন্ন দিনে ডিম, রুটি, দুধ, বিস্কুট ও ফল দেওয়ার কথা। তবে বাস্তবে এই মেনু অনুসরণ করা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত খাদ্যতালিকার অনেক উপকরণ প্রতিদিন সংগ্রহ ও সরবরাহ করা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবহন ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে খাবারের মান নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষা বিশ্লেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানহীন খাবার শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে পুষ্টিহীনতা, পেটের রোগসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতিও কমে যেতে পারে। তারা বলছেন, এই কর্মসূচিতে স্থানীয়ভাবে সহজে সংরক্ষণযোগ্য ও নিরাপদ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা এবং কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকলেও তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিম্নমানের খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।