যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় তেলের দাম কমেছে, শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত হ্রাস পায়। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী শিগগিরই আবার জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হতে পারে—এমন প্রত্যাশা। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। প্রণালীতে কার্যত যে অবরোধ তৈরি হয়েছে, তা কীভাবে পরিবর্তিত হবে এবং যুদ্ধবিরতি দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতের অবসান ঘটাবে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
মার্কিন ক্রুড তেলের ফিউচার্স লেনদেন-পরবর্তী সময়ে ১৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের নিচে নেমে আসে। যদিও এটি যুদ্ধ শুরুর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারির ৬৭ দশমিক ০২ ডলারের তুলনায় এখনও বেশি। একইভাবে, বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে ৯৪ দশমিক ৬৮ ডলারে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডাও ফিউচার্স এক হাজার পয়েন্টের বেশি বা প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার্স বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নাসডাক ফিউচার্স প্রায় ৩ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বুধবার সকালে এশিয়ার বাজারেও একই ধারা লক্ষ্য করা যায়। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪১ মিনিটে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ২ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা বব ম্যাকন্যালি বলেন, “বাজার ইতিবাচক খবরের অপেক্ষায় ছিল, তবে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলবে কি না, সেটি এখনও অনিশ্চিত। এ বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অবস্থান স্পষ্ট নয়।” যদিও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছেন, ইরান জানিয়েছে-এটি কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি-এ প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, “এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, তবে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অনুযায়ী সব সামরিক বাহিনীকে হামলা বন্ধ রাখতে হবে।”
বি. রাইলি ফাইন্যান্সিয়ালের প্রধান বাজার কৌশলবিদ আর্ট হোগান বলেন, শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি ও তেলের দামের পতন বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। তার ভাষায়, “বিনিয়োগকারীরা চান হরমুজ প্রণালী আবার স্বাভাবিকভাবে চালু হোক এবং এই সংঘাতের অবসান ঘটুক।”
মঙ্গলবার রাত ৮টার নির্ধারিত সময়সীমার দুই ঘণ্টা আগে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। এর আগে তিনি সতর্ক করেছিলেন, সমঝোতা না হলে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি জানান, ইরানের পক্ষ থেকে একটি ১০ দফা প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ এতে প্রভাবিত হয়। ফিউচার্স ও স্পট মার্কেট উভয় ক্ষেত্রেই সতর্ক সংকেত দেখা যাচ্ছিল।
তবে প্রণালীটি আগের মতো স্বাভাবিকভাবে চালু হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। ইরান দাবি করেছে, তারা এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে, যা দেশটিকে বিশেষ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এনে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। গ্যাসবাডির পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান বলেন, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও হরমুজ প্রণালী নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব মূল্যায়নে সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। করপে কারেন্সি রিসার্চের কার্ল শামোটা এক নোটে উল্লেখ করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
উপসংহার
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ কার্যক্রম এবং সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: সিএনএন