যুদ্ধবিরতির পর উভয় পক্ষের বিজয় দাবি, বাস্তব চিত্রে অনিশ্চয়তা
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে এই সমঝোতার পর উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী হিসেবে দাবি করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিশ্লেষণ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তে সম্মতি দেয়। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব অনুমোদন করে। এই সিদ্ধান্ত নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সম্মতিতে গৃহীত হয়েছে বলে জানানো হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা-তে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, এই যুদ্ধবিরতিকে তারা নিজেদের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে। তবে এটিকে চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথে একটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ইরানের পক্ষ থেকেও পাকিস্তানের এই উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ-এ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১০ এপ্রিল থেকে এই আলোচনা শুরু হতে পারে, যেখানে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির পর এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এটি আমাদের সম্পূর্ণ এবং সর্বাত্মক বিজয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই।” এর আগে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে একটি ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল, যা প্রথমে ইরান প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে সংশোধিত প্রস্তাবে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইরান তা পর্যালোচনা করে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানায়, যা পরে যুক্তরাষ্ট্রও গ্রহণ করে।
সংঘাত চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। সমঝোতায় না এলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে হোয়াইট হাউস। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লিভিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, এই যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত সাফল্য, যা সামরিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়। এর জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আসন্ন আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরান একটি ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পর উভয় পক্ষের বিজয় দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা অন্তত সাময়িকভাবে সংঘাত কমাতে ভূমিকা রাখবে। কে প্রকৃত বিজয়ী—সে প্রশ্নের চেয়ে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।