ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন এমন প্রার্থীদের সংখ্যা চূড়ান্ত হয়েছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ২৫৭ জন প্রার্থী ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই এবং মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে গত ১৯ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর নির্বাচন কমিশন (ইসি) আজ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত প্রার্থীতালিকা প্রকাশ করবে।
নির্বাচনে অংশ নিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), **ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ**সহ দেশের ৫১টি রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত যাচাই-বাছাইয়ে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হলে বৈধ প্রার্থী দাঁড়ান ১ হাজার ৮৪২ জন।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। এরপর ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল শুনানি শেষে ৪১৬ জন প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় বর্তমানে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫৭ জনে।
ইসির আপিল শুনানিতে চূড়ান্তভাবে ১৫০ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। এদের মধ্যে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রয়েছেন চারজন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী চারজন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন, জাতীয় পার্টির (জাপা ও জেপি) মোট ২১ জন, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ২২ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ৯৮ জন।
নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মনোনয়নপত্রে তথ্যগত অসঙ্গতি, ঋণখেলাপি হওয়া, মামলাজনিত জটিলতা, দ্বৈত নাগরিকত্ব, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকা এবং ১ শতাংশ ভোটার সমর্থন না পাওয়াসহ নানা কারণে এসব প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী, ইসিতে আপিল বাতিলের পর উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। ইসিতে আপিল নামঞ্জুর হওয়ার পর কয়েকজন প্রার্থী উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন। আপিল শুনানিকালে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইসির নিরপেক্ষতা নিয়েও অভিযোগ তোলে।
আপিল শুনানি শেষে জানা যায়, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপির মনোনীত চার প্রার্থী হলেন— কুমিল্লা-৪ আসনের মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, যশোর-৪ আসনের টিএস আইয়ুব, চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর এবং কুমিল্লা-১০ আসনের আবদুল গফুর ভুঁইয়া। বিএনপির বিদ্রোহী চার প্রার্থী হলেন— সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের মো. শফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-৬ আসনের মো. সাইফুল ইসলাম, কুমিল্লা-১০ আসনের মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া এবং যশোর-১ আসনের মো. মফিকুল হাসান তৃপ্তি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত একজন প্রার্থী হলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের ডা. এ কে এম ফজলুল হক। এর মধ্যে কুমিল্লা-১০ আসনের আবদুল গফুর ভুঁইয়া ও চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর প্রার্থিতা ফিরে পেতে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন।
জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত ১৪ জন এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) মনোনীত ৭ জন প্রার্থীর প্রার্থিতাও আপিল পর্যায়ে বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতের জোটের বাইরে থাকা ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর ২২ জন প্রার্থীর আপিল নামঞ্জুর করা হয়।
চূড়ান্তভাবে ৯৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জটিলতার কারণেই অধিকাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রার্থিতা হারিয়েছেন। এ ছাড়া ঋণখেলাপি হওয়া এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণেও একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর আপিল নামঞ্জুর করা হয়েছে।
নির্বাচন ভবনে টানা নয় দিনের শুনানি শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল শুনানিতে কোনো ধরনের পক্ষপাত করা হয়নি। তিনি বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটার সমর্থনের বিষয়টিও ছাড় দেওয়া হয়েছে। “আমরা চাই সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন হোক,”— বলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনের টিমের পক্ষ থেকে কোনো পক্ষপাতদুষ্ট রায় দেওয়া হয়নি।
এ সময় নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “যাদের ঋণখেলাপি হিসেবে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা আমরা মনে কষ্ট নিয়েই দিয়েছি। আইন যেহেতু অনুমতি দিয়েছে, সে কারণেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”