কুমিল্লা জেলায় মোট ১১টি সংসদীয় আসন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে জেলার ভোটের সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। তিনটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং আরও দুটি আসনে প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অযোগ্য ঘোষণার কারণে অন্তত ছয়টি আসনে বিএনপির পরাজয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব আসনে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে **বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী**সহ ১০–দলীয় জোটের প্রার্থীরা।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে কুমিল্লার তৎকালীন ১২টি আসনের মধ্যে বিএনপি জয় পায় আটটিতে। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলটি ১২টির মধ্যে ১১টি আসনে বিজয়ী হয়; বাকি একটি আসনে জয় পায় জামায়াতে ইসলামী। উল্লেখ্য, ওই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয়।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার ১১ আসনে মোট ৮১ জন প্রার্থী প্রতীক পেয়েছেন। এর মধ্যে ৭৬ জন দলীয় প্রতীকে এবং পাঁচজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্বতন্ত্রদের মধ্যে বিএনপির তিনজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। গত বুধবার কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. রেজা হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দেন।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, যার প্রতিফলন সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতেও দেখা গেছে। কুমিল্লার তিনটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী, দুটি আসনে দলের প্রার্থীর অযোগ্যতা এবং একটি আসন ঐতিহ্যগতভাবে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হওয়ায় জামায়াত–এনসিপি জোটের পাল্লা ভারী হয়ে উঠছে। ফলে কুমিল্লায় বিএনপির প্রায় ছয়টি আসন হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যেসব আসন বিএনপির হাতছাড়া হতে পারে
কুমিল্লা–২ (হোমনা ও তিতাস)
এই আসনে বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। আসনটি একসময় বিএনপির সাবেক মন্ত্রী মরহুম এম কে আনোয়ার–এর দখলে ছিল। তবে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–র এপিএস আব্দুল মতিন বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ভোট বিভক্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মো. নাজিম উদ্দিন মোল্লা এগিয়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কুমিল্লা–৪ (দেবিদ্বার)
বিএনপির প্রার্থী ও সাবেক চারবারের এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকে নির্বাচন কমিশন অযোগ্য ঘোষণা করায় মাঠ ফাঁকা হয়ে যায়। ফলে ১০–দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–এর মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এগিয়ে রয়েছেন। জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম শহীদ জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
কুমিল্লা–৭ (চান্দিনা)
এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ নিজ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেলেও বহিষ্কৃত নেতা আতিকুল ইসলাম শাওন বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ভোট বিভাজনের শঙ্কা রয়েছে। জামায়াত–এনসিপি জোটের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন খেলাফত মজলিসের সোলাইমান খান। এখানে মূল লড়াই হবে বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে।
কুমিল্লা–৯ (লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ)
বিএনপির সাবেক এমপি আনোয়ারুল আজিম–এর মৃত্যুর পর দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে আবুল কালামকে। তবে সাবেক এমপির কন্যা সামিরা আজিম দোলা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে জামায়াতের প্রার্থী ড. সৈয়দ একেএম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
কুমিল্লা–১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই)
বিএনপির সাবেক এমপি আব্দুল গফুর ভূঁইয়াকে নির্বাচন কমিশন অযোগ্য ঘোষণা করায় কার্যত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ফলে জামায়াতের প্রার্থী, সাবেক ছাত্রশিবির সভাপতি মাওলানা ইয়াসিন আরাফাত বড় চমক দেখাতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কুমিল্লা–১১ (চৌদ্দগ্রাম)
এই আসন ঐতিহ্যগতভাবে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি। জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। বিএনপির প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামরুল হুদা। ভোটারদের ধারণা, এখানে জামায়াত প্রার্থীই এগিয়ে।
যেসব আসনে বিএনপি তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে
এখনো পর্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন—
কুমিল্লা–১ (দাউদকান্দি–মেঘনা): খন্দকার মোশারফ হোসেন
কুমিল্লা–৩ (মুরাদনগর): শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়েকোবাদ
কুমিল্লা–৫ (বুড়িচং–ব্রাহ্মণপাড়া): জসীম উদ্দিন
কুমিল্লা–৬ (সিটি করপোরেশন–সদর): মনিরুল হক চৌধুরী
কুমিল্লা–৮ (বরুড়া): জাকারিয়া তাহের সুমন
এসব আসনে বড় ধরনের দলীয় কোন্দল না থাকায় বিএনপি প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।