আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এই সংবেদনশীল সময়ে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী–এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আজ সেনা সদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই নির্বাচনের গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।”
ভাষণের শুরুতে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই–আগস্টের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে—এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ফ্যাসিবাদ–পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত একটি জাতি ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিজের দেশের দায়িত্ব গ্রহণের যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, এই নির্বাচনে ভোটদান হবে তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে তাদের মতামত জানাবে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবে। এ কারণেই এবারের নির্বাচন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে তরুণদের একটি বড় অংশ প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বহু নাগরিক দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এমন বাস্তবতায় সব ভোটারের জন্য শঙ্কামুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নির্বাচন আয়োজন প্রসঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন, মাঠপর্যায়ে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল। সামান্য বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে—সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। প্রতিটি নাগরিক যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে, কোনো ধরনের প্রভাব ছাড়াই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বাহিনীর সক্ষমতা উপেক্ষিত ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার অল্প সময়ের মধ্যেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে উদ্যোগ নিয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তিনি জানান, স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ছাড়া নেদারল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ইতালি, জাপান ও থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে অনুরূপ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে। এসব উদ্যোগ সশস্ত্র বাহিনীর আভিযানিক দক্ষতা ও সক্ষমতা বহুলাংশে বাড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সেনা সদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস এম কামরুল হাসান। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত অতিথিরাও সভায় অংশ নেন।