বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে সামনে এসেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলমান রাজনৈতিক সংকট, মতপ্রকাশ ও বিরোধী রাজনীতির ওপর দমন–পীড়ন এবং অংশগ্রহণহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর জনগণ এখন একটি সত্যিকারের ফ্যাসিবাদমুক্ত, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছে।
এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার এবং জনগণের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে প্রয়োগের আকাঙ্ক্ষা। ফলে ত্রয়োদশ নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তার নির্ধারক মুহূর্ত।
প্রাথমিক পর্যায়ে একটি ধারণা ছিল যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনের জন্য সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ সময় প্রবাসে অবস্থান করায় মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। এমনকি তাঁর দেশে ফেরা বিলম্বিত হওয়ায় বিএনপি কৌশলগতভাবে নির্বাচন পেছাতে পারে—এমন ধারণাও তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। গত দেড় বছরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দৃঢ়তা নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। তবে একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, ভূমিদখল, প্রভাববিস্তার ও প্রশাসনিক অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ বিএনপির একটি অংশের বিরুদ্ধে উঠেছে, যা দলটির নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে দলীয় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা দলটির ভেতরে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির বার্তা দেয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে ভিন্ন ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে। সরাসরি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে তারা সমাজভিত্তিক রাজনীতি, কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক বিস্তারের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করেছে। মানবিক সহায়তা, শিক্ষা কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তারা একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নির্মাণে সচেষ্ট।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নির্বাচনি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী অনেক আগেই সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে যায়। প্রায় ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে প্রচারণা, সংগঠন সম্প্রসারণ এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রেখেছে দলটি। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংগঠিত শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে এবং নির্বাচনি মাঠে বিএনপির তুলনায় তাদের এগিয়ে রেখেছে।
নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কিছু বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মনোনয়ন বহাল থাকা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকর ভূমিকা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব প্রণয় ভার্মার সাক্ষাৎ—এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগকে অনেক বিশ্লেষক নিছক সৌজন্য হিসেবে দেখছেন না। বরং এগুলোকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক বার্তার অংশ হিসেবেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের কিছু প্রভাবশালী গণমাধ্যমে বিএনপিবান্ধব বয়ানের উপস্থিতি এবং দেশের ভেতরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দলকানা গণমাধ্যমের তৎপরতা। এসব অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমর্থনের সমন্বিত চিত্র রাজনৈতিক ভারসাম্য ও নির্বাচনি ন্যায্যতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে নির্ণায়ক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল ভোটের দিনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দিয়ে নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন সব দলের জন্য সমান প্রচারণার সুযোগ, প্রশাসনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদার ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নাতীত স্বাধীনতা।
এই উপাদানগুলো অনুপস্থিত থাকলে নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রতিফলন না হয়ে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের সামনে একটি কঠিন কিন্তু বাস্তব সিদ্ধান্ত হাজির হয়েছে। প্রকৃত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ মানে কার্যত অসম প্রতিযোগিতাকে বৈধতা দেওয়া।
অতীত অভিজ্ঞতা—বিশেষত ২০০৮ সালের নির্বাচন—আজও একটি সতর্কসংকেত হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত, যেখানে নির্বাচন প্রকৌশলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সুতরাং বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে যুক্তিসংগত ও দায়িত্বশীল পথ হলো—নির্বাচনের আগে একটি প্রকৃত ও কার্যকর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে জোরালো ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক সমতার নিশ্চয়তা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয় না; বরং তা বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ক্ষমতার প্রশ্নের চেয়েও বড়—এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।