বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই প্রায় প্রাণ হারাতে বসেছিলেন রাহাত হোসেন। পুলিশের গুলিতে আহত এক তরুণকে টেনে নিরাপদে নেওয়ার সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে সেই ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনই রূপ নেয় দেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে, যার মধ্য দিয়ে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় বিক্ষোভ দমনের সময় রাহাত হোসেন (২৪) ও ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়া (১৯) একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ সেখান থেকে তাদের টেনে বের করে মারধর করে এবং দৌড়াতে বাধ্য করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন তাইম। মাটিতে লুটিয়ে পড়া বন্ধুকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন রাহাত। তবে গুলি চালানো অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে রাহাতের পায়েও গুলি লাগে।
রাহাত বলেন, একসময় তাকে আহত বন্ধুকে ফেলে রেখেই সরে যেতে হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়াকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এই ধরনের সহিংস ঘটনাই দ্রুত ছাত্র আন্দোলনকে সারাদেশব্যাপী গণবিক্ষোভে রূপ দেয়, যার কেন্দ্র ছিল ঢাকা। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পতন ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান। জাতিসংঘের হিসাবে, ওই আন্দোলনে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। তাদের বড় অংশই নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে প্রাণ হারান।
শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনার কথা বলা হয়। বিশ্বব্যাপী জেনারেশন জেড–এর আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এটিকে অন্যতম সফল গণঅভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন ছাত্রনেতা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পান।
তবে জাতীয় নির্বাচন সামনে আসতেই সেই ছাত্রনেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক নারী নেত্রীও ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে পুরোনো দলগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
রাহাত হোসেন জানান, তিনি শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার প্রতিবাদে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। পরে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে স্বৈরশাসনের অবসান। এতে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয়—উভয় ধারার তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে রাহাতের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার ‘শান্তি, সমতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সুন্দর বাংলাদেশ’ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি ছাত্রনেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) অভিজ্ঞতাহীন মনে করেন। বরং সাম্প্রতিক সময়ে তার দৃষ্টি কেড়েছে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী।
দীর্ঘদিন জোট রাজনীতিতে সীমিত ভূমিকায় থাকা জামায়াত এবারের নির্বাচনে নিজস্ব শক্তি নিয়ে মাঠে নামছে। দলটির অতীত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তরুণদের একটি অংশ সেটিকে আর বড় বাধা হিসেবে দেখছে না। রাহাতের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় জামায়াত ছাত্রদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে।
ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌফিক হক বলেন, একাত্তরের অনেক পরে জন্ম নেওয়া তরুণ ভোটাররা জামায়াতের অতীতকে ভিন্নভাবে দেখেন। তার মতে, এটি প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। তরুণ ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতকেও শেখ হাসিনার শাসনের ভুক্তভোগী হিসেবে দেখছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশের শীর্ষ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতপন্থি ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীদের বড় ধরনের জয় জাতীয় রাজনীতির মনোভাবের পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর এই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ইসলামপন্থি সংগঠন ছাত্র সংসদের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
দেশে প্রতি ১০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় চারজনের বয়স ৩৭ বছরের নিচে। এই বাস্তবতা ছাত্রনেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।