আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণায় এখন সরগরম দেশের শহর, নগর ও বন্দর এলাকা। প্রার্থীদের শেষ দফার গণসংযোগের পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যেও চলছে হিসাব-নিকাশ। কোন প্রার্থী বা দলকে ভোট দেবেন—সে সিদ্ধান্ত নিতে নানা সমীকরণ মিলিয়ে দেখছেন অনেকেই। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে নারী, তরুণ ও প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ।
বিশেষ করে এই তিন শ্রেণির ভোট যদি কোনো একটি রাজনৈতিক ধারায় কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে নির্বাচনের ফল পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নারী ও তরুণ ভোটের বড় অংশ এবং প্রবাসী ভোটের উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দিকে যেতে পারে, যা ভোটের মাঠে ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে।
তরুণ ও নারী ভোটারই সবচেয়ে বড় শক্তি
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে তরুণ ভোটার (১৮–৩৭ বছর) ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬ জন, যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। নারী ভোটার রয়েছেন ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক।
এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দেয়, এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটারদের অবস্থান ফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
গত ১৭ বছরে ভোটার বেড়েছে সাড়ে চার কোটির বেশি
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশে মোট ভোটার ছিলেন ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। গত ১৭ বছরে ভোটার সংখ্যা বেড়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৮ হাজার ১৮০ জন।
বর্তমান ভোটারদের বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সী ভোটার ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৮ জন, ২২–২৫ বছরে ১ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১০৬, ২৬–২৯ বছরে ১ কোটি ২১ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ এবং ৩০–৩৩ বছরে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৬ হাজার ৬১৫ জন। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীই এবারের নির্বাচনে বড় অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করেছে।
ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল এক প্রজন্ম
বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে বড় অংশের তরুণ ভোটার কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বর্জন করায় ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং ভোট পড়ে মাত্র ৪০ দশমিক ০৪ শতাংশ।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ ওঠে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় ৫০টি আসনের মধ্যে ৩৩টিতেই অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়। বিরোধী দলগুলোর দাবি ছিল, নির্বাচন শুরুর আগেই ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট পড়ে গিয়েছিল।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনেও বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এসব নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে অনেক তরুণ বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে।
জরিপে ভোট দিতে আগ্রহ তরুণদের
তরুণদের ভোট দেওয়ার আগ্রহের বিষয়টি বিভিন্ন জরিপেও উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) ‘ইয়ুথ ম্যাটারস সার্ভে ২০২৫’-এ ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২ হাজার ৫৪৫ জনের মধ্যে ৯৭ শতাংশ ভোট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় দুর্নীতি নির্মূল, বেকারত্ব দূরীকরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) জরিপেও ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা ভোট দিতে আগ্রহী বলে জানান। যদিও ৬৭ শতাংশ মনে করেন অতীতের নির্বাচনগুলোয় কারচুপি হয়েছে, তবু ৮০ শতাংশ আশাবাদী যে আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।
নারী ভোটার টানতে জামায়াতের কৌশল
এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে মাঠে জোরালোভাবে কাজ করছে জামায়াতে ইসলামী। সরাসরি নারী প্রার্থী না থাকলেও নারী কর্মীদের প্রচার-প্রচারণায় দৃশ্যমান উপস্থিতি চোখে পড়ছে। দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে কাজ করতে না পারলেও ভেতরে ভেতরে সংগঠন শক্তিশালী করেছে মাহিলা জামায়াত।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে মহিলা জামায়াতকে। জেলা পর্যায়ের সমাবেশগুলোতেও নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।
জামায়াত নেত্রী ফেরদৌস আরা খানম বকুল বলেন, দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে না পারলেও ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে নারীরা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারী কর্মীদের এভাবে প্রকাশ্যে মাঠে নামানো জামায়াতের জন্য একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
তরুণ ভোটে প্রভাব ছাত্রসংসদ নির্বাচনের
তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে মনে করছে দলটি। সম্প্রতি ডাকসু, জাকসু, রাকসুসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সহযোগী সংগঠন ছাত্রশিবিরের প্রার্থীরা বড় জয় পেয়েছেন। নেতাদের ধারণা, এর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পড়তে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রশিবিরের কিছু নতুন কার্যক্রম তরুণ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
প্রবাসী ভোটেও আশাবাদী জামায়াত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই প্রবাসীদের ভোটাধিকারের দাবিতে সোচ্চার ছিল জামায়াত। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে এবার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন প্রবাসীরা।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২ জন প্রবাসী পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে ৪ লাখ ৮২ হাজার ৮১৭ জন ভোট দিয়েছেন। জামায়াতের ধারণা, এই ভোটের বড় অংশ তাদের প্রতীকের দিকে যাবে। পাশাপাশি প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের ভোটও একই ধারায় আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইশতেহারে নারী ও তরুণদের জন্য আলাদা অঙ্গীকার
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ইশতেহারে নারীর নিরাপত্তা, ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স, নিরাপদ গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সুবিধা ও গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তরুণদের জন্য ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরে ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার ও পাঁচ লাখ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রত্যেক উপজেলায় ‘ইউথ টেক ল্যাব’ ও ‘ই-ওয়ার্কহাব’ স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নারী, তরুণ ও প্রবাসী—এই তিন ভোটব্যাংক যদি একমুখী হয়, তাহলে এবারের নির্বাচনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।