জলাতঙ্কের টিকায় সংকট, মজুত নিয়েও ধোঁয়াশা
দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকির মধ্যেই এবার সামনে এসেছে জলাতঙ্কের টিকার ঘাটতির চিত্র। মাঠপর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে টিকা না পেয়ে রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ উঠছে। যদিও সরকারিভাবে টিকার সংকট নেই বলে দাবি করা হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জ শহরের বাসিন্দা রুবি আক্তার তাঁর ছেলেকে কুকুরে কামড়ানোর পর দ্রুত হাসপাতালে নেন। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, প্রয়োজনীয় টিকা নেই। পরে ধার করে টাকা জোগাড় করে বাইরে থেকে টিকা কিনতে হয় তাঁকে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেক রোগী।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক সংক্রমণ, যেখানে আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় শতভাগ। সাধারণত কুকুর বা বিড়ালের কামড়ের পর দুই ধরনের টিকা দেওয়া হয়—অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন (ARV) এবং র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (RIG)। এর মধ্যে দ্বিতীয়টির ঘাটতিই সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।
মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ৩০ জনের মতো মানুষ প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হয়ে টিকা নিতে আসেন। কিন্তু সরবরাহ সীমিত থাকায় সবাইকে টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আলাদা বাজেট না থাকায় নিজেদের তহবিল থেকে সীমিত পরিমাণ টিকা কিনে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে বিতরণ করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীর জানান, যাদের ঝুঁকি বেশি ও আর্থিক সামর্থ্য কম, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে টিকা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের বাইরে থেকে কিনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেকেই আর্থিক চাপে পড়ছেন।
শুধু জেলা শহর নয়, উপজেলা পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ। অনেক এলাকায় কোনো টিকাই পাওয়া যাচ্ছে না। বিপরীতে ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল-এ টিকা তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য থাকায় দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা সেখানে ভিড় করছেন।
এদিকে জলাতঙ্কের টিকার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক টিকাদান কর্মসূচি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর অধীনে বিভিন্ন টিকার মজুত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিয়ম অনুযায়ী অন্তত তিন মাসের ‘বাফার স্টক’ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে সেই মজুত নেই।ইপিআই কর্মকর্তাদের অনানুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, কিছু টিকার মজুত প্রায় শেষ হয়ে গেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন করে টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেছেন, দেশে কোনো টিকার সংকট নেই এবং ছয় মাসের মজুত রয়েছে। জলাতঙ্কের টিকার ঘাটতির বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র তার সঙ্গে মিলছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার ‘বাফার স্টক’ না থাকলে যে কোনো সময় সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে হামের মতো রোগের বিস্তার ইতোমধ্যেই সেই ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্যখাতের অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টিকা ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়া এই কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসায় অর্থায়ন ও সরবরাহ-দুই ক্ষেত্রেই সংকট দেখা দিয়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে-টিকার এই ঘাটতি দ্রুত কাটানো না গেলে জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।