দেশে অস্বাভাবিক কম দরে ফল ও কৃষিপণ্য আমদানির তথ্য ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ ঘিরে একটি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের বিষয় সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান ‘গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজ’ দীর্ঘ তিন বছরে ভারত থেকে আপেল, টমেটো ও কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন পণ্য অত্যন্ত কম দরে আমদানি দেখিয়েছে, যা বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১২৫ কোটি টাকার সমমূল্যের আমদানি দেখানো হয়, যার বড় অংশই হয়েছে একটি নির্দিষ্ট বিদেশি সরবরাহকারীর মাধ্যমে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ থেকে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ২৩১টি এলসির মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এসব এলসি তিনটি বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে খোলা হয়। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখা থেকেই সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়, যেখানে ১৭৪টি এলসির বিপরীতে বিপুল অঙ্কের ফল আমদানি দেখানো হয়। প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমেও পৃথকভাবে লেনদেন সম্পন্ন হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, আমদানির জন্য ব্যবহৃত বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি মূলত শাড়ি, থ্রি-পিস ও ইমিটেশন গহনা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, ফল বা সবজির ব্যবসার সঙ্গে তাদের কোনো সুস্পষ্ট সম্পৃক্ততা নেই বলে জানা গেছে। এতে আমদানি লেনদেনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক অনলাইন মনিটরিং সিস্টেমে প্রাথমিকভাবে দেখতে পায়, প্রতি কেজি আপেল মাত্র ৩৩ টাকায়, কাঁচামরিচ ও টমেটো ২৮ টাকায় আমদানি দেখানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজার দরের তুলনায় অনেক কম। দেশে যখন আপেলের দাম কয়েকশ টাকা, তখন এই ধরনের নিম্নদরে আমদানি দেখানোকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারিয়েছে, অন্যদিকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিকের দাবি, আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত খরচ, শুল্ক, পরিবহন ব্যয় ও নষ্ট পণ্যের হিসাব যুক্ত করলে বাজারে বিক্রয়মূল্য স্বাভাবিক ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক যাচাই-বাছাই করেই এলসি অনুমোদন দিয়েছে, ফলে অনিয়মের সুযোগ নেই।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন বাজারমূল্য যাচাই না করেই এত কম দরে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হলো। একই সঙ্গে এলসি সীমা অতিক্রম করে কীভাবে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে, তারও ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।
বর্তমানে পুরো বিষয়টি পরিদর্শন পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।