সয়াবিন তেলের সব নমুনায় মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর গবেষকদের যৌথ এক গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের সব নমুনাতেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় সবচেয়ে বেশি দূষণ ধরা পড়েছে খোলা সয়াবিন তেলে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত গবেষণায় ৬০টি নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষকরা বিষয়টিকে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক। গবেষণার জন্য তেজগাঁও, উত্তরা ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সুপারশপ এবং খোলা বাজার থেকে সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে আধুনিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির মাধ্যমে এসব নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে, যা বোতলজাত তেলের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। তেজগাঁও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা খোলা তেলের নমুনায় দূষণের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি।
গবেষকদের মতে, শিল্পাঞ্চলের নিকটবর্তী অবস্থান, প্লাস্টিক ও বস্ত্রশিল্পের প্রভাব, পুনর্ব্যবহৃত সংরক্ষণ পাত্রের ব্যবহার এবং খোলা অবস্থায় বিক্রির কারণে তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং ও পরিবহনের বিভিন্ন ধাপেও এসব কণা তেলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষণায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক উপাদান শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন, হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট, পলিইউরেথেন এবং নাইলন। গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতির তথ্য এই গবেষণার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সামনে এসেছে।
পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রায় ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল আঁশজাতীয়। এর মধ্যে স্বচ্ছ রঙের কণার আধিক্য ছিল সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ কণার আকার ছিল ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরও বেশি; তারা প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা গ্রহণ করতে পারে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন শিশু তার জীবদ্দশায় প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার সংস্পর্শে আসতে পারে।
অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে একটি উদীয়মান পরিবেশগত দূষক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব কণা মানবদেহে প্রবেশ করলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বিপাকীয় জটিলতা, অন্ত্রের প্রদাহ এবং প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। অতি ক্ষুদ্র কণা রক্তপ্রবাহেও প্রবেশের সক্ষমতা রাখে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (EFSA) খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি, তবুও বিশেষজ্ঞরা এটিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছেন।
গবেষকরা বলছেন, দেশে খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। তারা ভোজ্যতেলের উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি খোলা তেল বিক্রির ওপর নিবিড় নজরদারির সুপারিশ করেছেন।
সম্প্রতি দেশের দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে।