সামান্য বৃষ্টিতেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে জাতীয় সংসদ ভবনের বিভিন্ন স্থানে। মূল ভবনের পাশাপাশি দক্ষিণ প্লাজা, ভিআইপি বাংলো, মন্ত্রী হোস্টেল, পুরোনো সংসদ সদস্যদের হোস্টেল এবং সচিব হোস্টেলেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন অংশে পানি ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে সংসদ ভবনের মেইন মেকানিক্যাল প্ল্যান্ট (এমএমপি)। সেখানে থাকা প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পানি থেকে যন্ত্রপাতি রক্ষায় ইতোমধ্যে কয়েকটি অংশে অস্থায়ীভাবে টিনের ছাউনি দেওয়া হয়েছে। তবে পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ ঘটলে শর্টসার্কিটসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার নিচের অংশে এমএমপি অবস্থিত। এখান থেকেই সংসদ ভবনের কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। একই স্থানে রয়েছে জিআইএস প্যানেল, ছয়টি জেনারেটর, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং সেন্ট্রাল স্টোর রুম। বৃষ্টি হলেই ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কক্ষে ঢুকে পড়ছে।
এমএমপিতে থাকা বিপুল মূল্যের যন্ত্রপাতি নিয়ে উদ্বেগের কারণও রয়েছে। পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী হওয়ায় যন্ত্রপাতির সঙ্গে পানির সংস্পর্শ ঘটলে শর্টসার্কিট থেকে আগুন কিংবা বৈদ্যুতিক বিপর্যয়ের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এতে সংসদ ভবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ঝুঁকি কমাতে দক্ষিণ প্লাজার ছাদের নিচে যন্ত্রপাতিগুলোর ওপর অস্থায়ী টিনের আচ্ছাদন তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি সংসদ ভবনের যেসব স্থান দিয়ে পানি ঢুকছে, সেসব জায়গা চিহ্নিত করে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্লাস ব্রিকসের সংযোগস্থলগুলো সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন ভবনের ছাদ পানি প্রতিরোধী করার কাজ চলছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিবর্তে এ ধরনের অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থাপত্য ও রক্ষণাবেক্ষণসংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত পরিচর্যার অভাব ও নানা অব্যবস্থাপনার কারণে খ্যাতনামা স্থপতি লুই আই কানের নকশায় নির্মিত জাতীয় সংসদ ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংসদ ভবনের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু কাজ শুরু হয়েছে।
সদ্য শেষ হওয়া বাজেট অধিবেশনে সংসদ ভবনের পানি পড়ার বিষয়টি সামনে আনেন সরকারি দলের হুইপ জিকে গউছ। তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মসজিদের সামনে পর্যন্ত বৃষ্টির পানি সামলাতে সারিবদ্ধভাবে বালতি রাখতে হয়েছে। অথচ একই সময়ে সংসদে বিপুল অঙ্কের জাতীয় বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে। সংসদ ভবনের ভেতরের এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালও সংসদ ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। নিজের কক্ষেও একই ধরনের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এরপর বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি জানান, সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এবং সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার সংসদে উপস্থিত গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মন্ত্রীও সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত এর প্রতিকার হবে বলে জানান।
জানা গেছে, সংসদ ভবনের যেসব স্থানে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে, সেসব জায়গায় মেরামতের কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। তবে কাজের গতি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করা না হলে সাময়িক মেরামত দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।