রাজধানীতে রিকশা চলাচলে নতুন শৃঙ্খলা, এক জোনের রিকশা অন্য জোনে নয়
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ন্ত্রণে জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থায় ঢাকা শহরকে আটটি জোনে ভাগ করে নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে এসব রিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। প্রতিটি জোনের রিকশার জন্য থাকবে আলাদা রং। ফলে এক জোনে নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে প্রবেশ করতে পারবে না।
অবৈধ রিকশা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি যানে কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল নিবন্ধন চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। কিউআর কোড স্ক্যান করে রিকশার মালিক ও চালকের তথ্য জানা যাবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে সৌরবিদ্যুৎনির্ভর চার্জিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকার অলিগলি পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশার বেপরোয়া চলাচল নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। অনেক চালকের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বৈধ লাইসেন্স না থাকায় এসব যান দুর্ঘটনা ও যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন গ্যারেজে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
নতুন পরিকল্পনার বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা নেই; বরং এগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। আটটি জোনে ভাগ করা হলে নির্দিষ্ট এলাকার ধারণক্ষমতার বেশি রিকশা চলাচল করতে পারবে না।
তিনি বলেন, বাসাবাড়ি কিংবা বাণিজ্যিক সংযোগের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হবে। এর পরিবর্তে সোলার চার্জিং স্টেশনের মাধ্যমে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চালকদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত না করে সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। পৃথক রং ও কিউআর কোডভিত্তিক নিবন্ধন চালু হলে অবৈধ এবং অন্য জোনের রিকশা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম জানান, দক্ষিণ সিটি এলাকায় জরিপ ও জোন নির্ধারণের কাজ শুরু হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশন যৌথভাবে পুরো ঢাকা শহরকে আটটি জোনে ভাগ করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি জোনের রিকশার জন্য নির্দিষ্ট রং নির্ধারণ করা হবে। কোনো রিকশা নির্ধারিত এলাকার বাইরে গেলে ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং ট্রাফিক পুলিশের সহায়তায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএসসিসি প্রশাসক আরও বলেন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি রিকশায় স্থায়ী কিউআর কোড যুক্ত থাকবে। সেটি স্ক্যান করলে সংশ্লিষ্ট রিকশার চালক ও মালিকের তথ্য পাওয়া যাবে। এতে রিকশা চুরি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলবে।
সোলার চার্জিং হাব স্থাপনের জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি। নগর পরিকল্পনাবিদরা সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে মূল সড়কের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ সড়কে সীমাবদ্ধ রাখা এবং জোনের প্রবেশপথ ও সীমানায় নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি রিকশা ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে পর্যাপ্ত সোলার চার্জিং স্টেশন দ্রুত স্থাপন করতে হবে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনের জন্য দ্রুত একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে এসব যান নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নামমাত্র ফিতে চালকদের লাইসেন্স দেওয়া হলে সরকার রাজস্ব আয় করতে পারবে এবং একই সঙ্গে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা হবে।