১৮০ দিনের কর্মসূচি শেষে প্রশাসনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
দক্ষ, সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের খুঁজে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি
নতুন সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে প্রশাসন পুনর্গঠনের উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। প্রশাসনে গতি ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও সততা মূল্যায়নের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরগুলোতে দক্ষ, সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসনকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, প্রশাসনে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত বা অতীতে বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের পরিবর্তে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সামনে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনতে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মপরিকল্পনা পাঠিয়ে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে নীতিনির্ধারকদের মতে, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রশাসনিক গতি এখনও অর্জিত হয়নি।
এ অবস্থায় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে মেধা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (পিডিএস) ও কর্ম-অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। এছাড়া অতীতে পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত অভিজ্ঞ কিছু অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ লক্ষ্যে কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মজীবনের তথ্য ও মূল্যায়ন পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব কমিয়ে একটি পেশাদার ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এজন্য দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী বলেছেন, প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৮০ দিনের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর প্রশাসন পুনর্গঠনের কাজ আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রশাসনকে আরও কার্যকর করা হবে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির কারণে অনেক ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়ে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনিক সংস্কার এগিয়ে নিতে চায়। এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক সমন্বয় সভায় ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্যসমূহ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সভায় নথি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, বিসিএস পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করা, মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর ও সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো হালনাগাদ এবং গবেষণা নীতিমালা অনুমোদনের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থায় সচিব ও সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার ৮১ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি অধিদপ্তর ও সংস্থায় নতুন মহাপরিচালক, চেয়ারম্যান এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কিছু পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকের মতে, একটি কার্যকর ও জনমুখী প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে দক্ষ, মেধাবী এবং দুর্নীতিমুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্বে আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।