রাজধানীর শাহবাগে একসময় শিশু-কিশোরদের হাসি-আনন্দে সরগরম থাকত শহীদ জিয়া শিশু পার্ক। ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে সেখানে ভিড় জমাতেন রাজধানীবাসী, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও শিশুরা ছুটে আসত বিনোদনের আশায়। কিন্তু সংস্কার ও আধুনিকায়নের নামে ২০১৯ সালের শুরুতে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই চেনা দৃশ্য আর ফেরেনি। এক বছরের মধ্যে নতুন সাজে পার্কটি খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও সাত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি কাজ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয় নিয়ে। সর্বশেষ হিসাবে পার্কটির ভৌত কাজ এগিয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। অথচ এরই মধ্যে প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকায়। অর্থাৎ শুরুর হিসাবের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫২৬ কোটি টাকা।
ডিএসসিসি এখন আগামী বছরের জুনের মধ্যে পার্কটি চালুর লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু যেখানে সাত বছরের বেশি সময়েও ৭০ শতাংশ কাজ বাকি, সেখানে নতুন সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প শেষ করা কতটা সম্ভব তা নিয়েই দেখা দিয়েছে সংশয়।
কীভাবে শুরু হলো দীর্ঘসূত্রতা?
২০১৯ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের কাজের সঙ্গে সমন্বয় করে শিশু পার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ কারণে পুরনো রাইডগুলো সরিয়ে পার্কটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তখন ধারণা ছিল, আধুনিকায়নের কাজ দ্রুত শেষ করে অল্প সময়ের মধ্যেই শিশুদের জন্য পার্কটি আবার খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের বাস্তবায়নও পিছিয়ে যেতে থাকে।
প্রথম পর্যায়ে আধুনিকায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৮ কোটি টাকা। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বড় পরিসরে নতুন পরিকল্পনা নেয়। ২০২৩ সালের আগস্টে ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলেও কাজ সম্পন্ন হয়নি। এরপর নতুন করে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পার্কটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৪৪১ কোটি টাকা শুধু ১৫ রাইডে!
প্রকল্পের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিশুদের জন্য ১৫টি আধুনিক রাইড কেনা ও স্থাপনে। এ খাতে প্রায় ৪৪১ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ।
প্রকল্পের মোট অর্থের মধ্যে প্রায় ৪৮৩ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ১২০ কোটি টাকা ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেওয়ার কথা। এত বড় প্রকল্পে রাইড কেনার পেছনে বিপুল অর্থ বরাদ্দ এবং সেই রাইড কেনার প্রক্রিয়াতেই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান জানিয়েছেন, রাইড কেনার দরপত্র এরই মধ্যে দুইবার বাতিল হয়েছে। এখন তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। এবার প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার আশা করছে সংস্থাটি।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালামও জানিয়েছেন, অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক ১৫টি রাইড কেনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে এবং আগামী বছরের জুনে পার্কটি চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।
মাঠে কতটা এগিয়েছে কাজ?
সম্প্রতি পার্ক এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, পুরনো স্থাপনা ও রাইড সরিয়ে নেওয়ার পর নতুন অবকাঠামোর কিছু কাজ হয়েছে। ড্রেনসহ কয়েকটি নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হলেও পুরো এলাকায় বড় ধরনের কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়েনি। ফলে প্রকল্পের বর্তমান গতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। তবে রাইড কেনা, সেগুলো স্থাপন এবং পরীক্ষামূলকভাবে চালাতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে আরও ছয় মাস সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি জানান।
চার দশকের পুরনো বিনোদনকেন্দ্র
শাহবাগের শিশু পার্কটির যাত্রা শুরু ১৯৭৯ সালে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৩ সালে পার্কটি তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শুরুতে এর নাম ছিল ‘ঢাকা শিশু পার্ক’।
পরবর্তী সময়ে অবিভক্ত ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সময়ে এর নাম হয় ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’। এরপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পার্কটির নাম পরিবর্তন করে ‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পার্ক’ রাখা হয়। পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’।
নাম বদলেছে একাধিকবার, পরিকল্পনাও বদলেছে; কিন্তু শিশুদের জন্য পার্কটি কবে পুরোপুরি খুলবে—সেটিই এখন নগরবাসীর বড় প্রশ্ন। সাত বছরের বেশি সময়ের অপেক্ষার পর ২০২৭ সালের জুনের লক্ষ্য কি এবার বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি সময় ও ব্যয়ের পাল্লা আরও ভারী হবে তা দেখার অপেক্ষা।