রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের উত্তেজনার ইঙ্গিত দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে কিছুটা সময় দেওয়া হচ্ছে, তবে এই সময় দীর্ঘায়িত হবে না। চূড়ান্ত কর্মসূচির ডাক এলে সবাইকে রাজপথে নামতে হবে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ চলাকালে ফেনীর মহিপালে আয়োজিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা কোনো দলীয় স্বার্থে কিংবা কাউকে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজপথে নামেননি। বরং দেশে নতুন করে ফ্যাসিবাদের কোনো আলামত দেখা দিলে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেই এই কর্মসূচি।
তিনি বলেন, অতীতে ফ্যাসিবাদী পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে জনগণকে দীর্ঘ সময় আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। এতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু নতুন করে কেউ একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইলে এবার জনগণ তা সহজে মেনে নেবে না।
‘কোনো চোখ রাঙানিকে ভয় করি না’
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হুমকি বা চাপকে ভয় না পাওয়ার কথা জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, দীর্ঘদিন যারা একসঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তারা পরস্পরের অবস্থান সম্পর্কে জানেন। অতীতে যারা সাধারণ মানুষকে নিয়ে রাজপথে নামতে পারেনি, তাদের এখনকার হুমকি-ধমকিতে তিনি বিচলিত নন।
তিনি বলেন, তাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তারা কোনো চোখ রাঙানিকে ভয় করেন না। তাদের ভয় একমাত্র সৃষ্টিকর্তাকে।
‘দেশ ছাড়িনি, জনগণের সঙ্গেই ছিলাম’
জনগণের পাশে থাকার প্রত্যয় জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশই তাদের একমাত্র ঠিকানা। অতীতে নানা ধরনের দমন-পীড়নের মুখোমুখি হলেও তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি।
তার ভাষ্য, কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা দেশের মাটিতে অবস্থান করেছেন এবং জনগণের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছেন। সামনেও একইভাবে জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংকট কিংবা কঠিন পরিস্থিতি—যাই আসুক, তারা জনগণকে ছেড়ে যাবেন না।
বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও সরকারের সমালোচনা
দেশের চলমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ফেনী পর্যন্ত আসার পথে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ না থাকার চিত্র দেখা গেছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে সংকট নেই বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেখানে সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছেন, সেখানে সংকট নেই—এমন বক্তব্য কীভাবে দেওয়া হয়।
‘জনগণের অধিকার কেড়ে নিলে প্রতিরোধ হবে’
জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হলে বিরোধী দল নীরব থাকবে না বলেও সতর্ক করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, জনগণের অধিকার নিয়ে টান দিলে বিরোধী দলের দায়িত্ব হলো প্রতিবাদ করা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। ক্ষমতাসীনরা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয়করণ ও অনিয়ম চালালে বিরোধী দল তা দেখে চুপ করে বসে থাকবে না।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পক্ষ জয়ী হলে জনগণের রায় মেনে নেওয়া এবং তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়নি।
তার অভিযোগ, জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করে সরকার মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। জনগণের দাবি পূরণ করা কোনো সরকারের অনুগ্রহ নয়; এটি তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব।
ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা সংরক্ষণ, জুলাই গণহত্যার বিচার, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবি সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য এই লংমার্চের আয়োজন করে।
মহিপালের পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে দুপুর থেকেই মহিপাল ফ্লাইওভারের দক্ষিণ পাশে নেতাকর্মীদের জমায়েত শুরু হয়। ফেনীর ছয় উপজেলা ছাড়াও নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন এলাকার নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন।
পথসভা শেষে লংমার্চটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়।