বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু শিল্পীর জনপ্রিয়তা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। মহানায়ক উত্তম কুমার সেই বিরল শিল্পীদের একজন। অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় থেকে উত্তম কুমার হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি এমন এক অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যা আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক আবেগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জন্মের শতবর্ষে এসে তার জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রের প্রধান নায়ক হলেও উত্তম কুমারের আবেদন কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে থাকেনি। বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও তিনি ছিলেন সমানভাবে প্রিয়। মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দুই বাংলায় তার অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের প্রতি দর্শকের আগ্রহ এতটুকু কমেনি।
ষাট ও সত্তরের দশকে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে উত্তম কুমারের জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে তৈরি করেছিল এক অনন্য রোমান্টিক আবহ। তাদের অভিনীত সিনেমাগুলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দর্শকদের মধ্যেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। উত্তম কুমারের অভিনয়ের পাশাপাশি তার ব্যক্তিত্ব, পোশাকের ধরন, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং পর্দায় উপস্থিতি ঢাকার দর্শকদেরও গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও প্রদর্শন-সংক্রান্ত নানা কারণে কলকাতার সিনেমার সরাসরি প্রদর্শনের সুযোগ সীমিত হলেও উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। ভিসিআর, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তার সিনেমা দর্শকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সিনেমা দেখার মাধ্যম বদলালেও নতুন প্রজন্মের কাছেও তার অভিনয় এখনও আকর্ষণের বিষয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় না করলেও এ দেশের একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গে উত্তম কুমারের কাজের সূত্রে তৈরি হয়েছিল স্মরণীয় এক অধ্যায়। ১৯৭৬ সালে পরিচালক পীযূষ বসুর ‘বহ্নিশিখা’ চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী অলিভিয়া গোমেজ।
২৬ নভেম্বর ১৯৭৬ কলকাতায় মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটি দুই বাংলার দর্শকদের মধ্যেই আগ্রহ তৈরি করেছিল। তৎকালীন ঢাকাই চলচ্চিত্রের আলোচিত অভিনেত্রী অলিভিয়া গোমেজের সঙ্গে মহানায়ক উত্তম কুমারের একই চলচ্চিত্রে অভিনয় আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কৌতূহল জাগানো একটি অধ্যায়।
প্রযুক্তি বদলেছে, সিনেমা দেখার মাধ্যম বদলেছে, বদলে গেছে দর্শকের রুচি ও বিনোদনের ধরনও। কিন্তু উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে যায়নি। বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার অভিনয় নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে।
বাংলা চলচ্চিত্রের দুই ভুবনের দর্শকদের আবেগকে একই বন্ধনে যুক্ত করা মহানায়ক উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি। তাই তার নাম শুধু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতেও চিরস্থায়ী হয়ে আছে।