মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি বিএনপির মহাসচিব কে হবেন?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেলে বিএনপির মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসা প্রায় নিশ্চিত। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে মহাসচিবের পদ ছাড়তে হবে তাঁকে। এরপর দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেতে পারেন।
তবে রিজভীর এই দায়িত্ব পাওয়া স্থায়ী মহাসচিব হওয়ার নিশ্চয়তা নয়। দলীয় কাউন্সিল কিংবা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে পরবর্তী সময়ে নতুন মহাসচিব নির্ধারণ করা হতে পারে। ফলে মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা তুঙ্গে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে চার নেতার নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। তাঁরা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
তবে সরকার ও দলীয় সংগঠনকে আলাদা রাখার পরিকল্পনা থাকলে মন্ত্রিসভায় থাকা নেতাদের পরিবর্তে দল পরিচালনায় পূর্ণ সময় দিতে পারবেন-এমন সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হচ্ছেন রিজভী
মির্জা ফখরুল মহাসচিবের পদ ছাড়ার পর অন্তর্বর্তী সময়ে রুহুল কবির রিজভীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে দলীয় সূত্রগুলো মনে করছে। বিএনপির গঠনতন্ত্র ও অতীতের নজির অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রিজভী বলেন, মহাসচিব পদ নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তা তাঁর জানা নেই। তবে তিনি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশেই সংকটকালীন সময়ে নেতা-কর্মীদের পাশে ছিলেন এবং এখনো সেই দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা দলের চেয়ারম্যান ও নীতিনির্ধারকেরাই ঠিক করবেন বলে জানান তিনি।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, ২০০৯ সালের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। এই ধারাবাহিকতায় মির্জা ফখরুলের পর রিজভীকেও প্রথমে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হতে পারে বলে মনে করছেন দলের নেতারা।
আলোচনায় সালাহউদ্দিন ও ডা. জাহিদ
সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নামও জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং কৌশল নির্ধারণে দক্ষতার কারণে তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একইভাবে আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতাও তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রেখেছে।
দলীয় পর্যায়ে এমন আলোচনাও রয়েছে, মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হলে ডা. জাহিদকে বর্তমান মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে শুধু দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হতে পারে।
এ্যানিও আলোচনায়
মহাসচিব পদের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। ছাত্ররাজনীতি থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে উঠে আসা এ নেতা দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করা, সাংগঠনিক সংকট মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকার কারণে তাঁকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রিজভীর নাম কেন এগিয়ে
দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, সরকার গঠনের আগে মহাসচিব পদ নিয়ে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদের নামও ছিল। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় তাঁদের সরকারি কাজে ব্যস্ততা বেড়েছে। অন্যদিকে রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। দলের কঠিন সময়ে নিয়মিতভাবে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কারণে তৃণমূলেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে।
এ কারণে মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রিজভীর নাম তুলনামূলকভাবে বেশি আলোচনায় রয়েছে। তবে দলীয়ভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
দল ও সরকার আলাদা রাখার ভাবনা
বিএনপির ভেতরে আলোচনা রয়েছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হতে পারে। সরকার ও দলকে আলাদা রেখে পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
সে ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা নেতাদের পরিবর্তে দল পরিচালনায় বেশি সময় দিতে পারবেন এমন কাউকে মহাসচিব করা হতে পারে। নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব তখন শুধু সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়, তৃণমূল সংগঠন শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কাউন্সিল নাকি তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত?
মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা নির্ধারণে বিএনপির সামনে দুটি পথ রয়েছে। জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন মহাসচিব নির্বাচন করা হতে পারে। আবার কাউন্সিলের আগেই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতাবলে কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন। দলীয় সূত্রের মতে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে স্থায়ী মহাসচিব নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হওয়া-দুটি পৃথক বিষয়।
চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হতে পারে বলে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিব নির্বাচনের সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলের চেয়ারম্যানের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেষ সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের হাতেই
সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিএনপির নতুন মহাসচিব কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপরই নির্ভর করবে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক আনুগত্য, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ, সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়ের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা-এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এই মুহূর্তে সালাহউদ্দিন আহমদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও রুহুল কবির রিজভীর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকলেও শেষ মুহূর্তে অন্য কাউকেও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আবার ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রিজভীর দায়িত্ব পালন ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।