দুর্যোগ কখনো পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। কখনো কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থায় পরিণত করতে পারে। ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, আকস্মিক বন্যা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া নাও যেতে পারে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিপদের মুহূর্তে শিশুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া একটি বড় দায়িত্ব। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো নিয়মিত ও বাস্তবভিত্তিক দুর্যোগ মহড়া।
দুর্যোগ মহড়া কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি একটি জীবন রক্ষাকারী অনুশীলন। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যদি আগে থেকেই জানে জরুরি পরিস্থিতিতে কে কী করবে, কোথায় যেতে হবে এবং কোন পথ ব্যবহার করতে হবে, তাহলে প্রকৃত দুর্যোগের সময় আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি রয়েছে। অঞ্চলভেদে ঝুঁকির ধরনও ভিন্ন। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং শহরাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ফলে সব বিদ্যালয়ের জন্য একই ধরনের মহড়া না করে স্থানীয় ঝুঁকির ভিত্তিতে মহড়ার ধরন নির্ধারণ করা উচিত।
মহড়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রথমত, মহড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ের জরুরি বহির্গমন পথ, নিরাপদ স্থান এবং দায়িত্ব বণ্টনের দুর্বলতা আগেই শনাক্ত করা যায়। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবর্তে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। সর্বোপরি, মহড়া একটি বিদ্যালয়ের দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনাকে বাস্তবতার সঙ্গে যাচাই করার সুযোগ দেয়।
তবে মহড়ার সফলতা নির্ভর করে এর গুণগত মানের ওপর। শুধু শিক্ষার্থীদের মাঠে দাঁড় করিয়ে উপস্থিতি নেওয়া কিংবা ছবি তুলে প্রতিবেদন তৈরি করা প্রকৃত দুর্যোগ মহড়া নয়।
কার্যকর দুর্যোগ মহড়ায় যা থাকা প্রয়োজন
একটি বিদ্যালয়ে মহড়া আয়োজনের আগে অন্তত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নির্ধারণ করা প্রয়োজন—
- ঝুঁকি নির্ধারণ: বিদ্যালয়টির প্রধান দুর্যোগ ঝুঁকি কী, তা চিহ্নিত করা।
- দায়িত্ব বণ্টন: শিক্ষক, কর্মচারী ও প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব স্পষ্ট করা।
- নিরাপদ স্থান: বিদ্যালয়ের ভেতর ও বাইরে নিরাপদ সমাবেশস্থল নির্ধারণ করা।
- জরুরি বহির্গমন পথ: বিকল্পসহ নিরাপদ ও বাধামুক্ত পথ নিশ্চিত করা।
- শিক্ষার্থীর হিসাব: শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীদের দ্রুত গণনা ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা।
- প্রাথমিক চিকিৎসা: জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা।
- যোগাযোগ ব্যবস্থা: অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন ও জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা।
মহড়ার পর মূল্যায়ন জরুরি
মহড়া শেষ হওয়ার পরই আসল কাজ শুরু হওয়া উচিত। কত সময়ে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ স্থানে পৌঁছেছে, কোন পথে সমস্যা হয়েছে, কোনো শিশু আতঙ্কিত হয়েছে কি না, শিক্ষকরা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছেন কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনা করতে হবে।
প্রয়োজনে একটি সংক্ষিপ্ত After Action Review করা যেতে পারে। এতে চিহ্নিত দুর্বলতার ভিত্তিতে পরবর্তী মহড়ার পরিকল্পনা সংশোধন করা সম্ভব হবে।
শিশুর জন্য মহড়া হবে সহজ ও ব্যবহারিক
দুর্যোগ মহড়াকে শিশুদের কাছে ভয়ভিত্তিক না করে শিক্ষামূলক ও অংশগ্রহণমূলক করতে হবে। গল্প, অভিনয়, কুইজ, ছবি এবং ব্যবহারিক অনুশীলনের মাধ্যমে শিশুদের শেখানো যেতে পারে। তাদের বোঝাতে হবে—দুর্যোগের সময় দৌড়াদৌড়ি নয়, আতঙ্ক নয়; বরং শান্ত থেকে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করাই নিরাপদ পথ।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রতিবন্ধী শিশু, ছোট শিশু এবং অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন এমন শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। কার সহায়তায় তারা নিরাপদ স্থানে যাবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নীতিগতভাবে যা করা প্রয়োজন
দুর্যোগ মহড়াকে বিদ্যালয়ের বার্ষিক কার্যক্রমের একটি নিয়মিত অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না; বিদ্যালয় পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, নিরাপদ অবকাঠামো এবং স্থানীয় জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্যোগের সময় ‘কী করতে হবে’—এই জ্ঞান শুধু বই পড়ে অর্জন করা যায় না। প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন। একজন শিশু যখন মহড়ার মাধ্যমে বিপদের সময় সঠিক জায়গায় যেতে শেখে, একজন শিক্ষক যখন জরুরি দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত হন, তখন পুরো বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
অতএব, দুর্যোগ মহড়াকে আনুষ্ঠানিকতা, ছবি তোলা বা প্রতিবেদন তৈরির কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জীবন রক্ষার অনুশীলন, প্রস্তুতির পরীক্ষা এবং নিরাপদ বিদ্যালয় গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
দুর্যোগের মুহূর্তে প্রস্তুতির জন্য সময় পাওয়া যায় না। প্রস্তুতি নিতে হয় তার আগেই। তাই আমাদের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—
মহড়া হবে নিয়মিত, প্রস্তুতি হবে বাস্তবসম্মত, আর প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।