বৃষ্টি, অন্ধকার কিংবা দুর্যোগ কিছুই ঠাকুরগাঁওবাসীর উচ্ছ্বাসে বাধা হতে পারেনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে নাগরিক সংবর্ধনা পেয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর সেই সংবর্ধনায় দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি দিয়েছেন সংঘাতের পথ ছেড়ে সংলাপ ও সমঝোতার রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
রোববার বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনায় বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি। এ সময় তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও হানাহানি ও সংঘর্ষ নয়, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সহিষ্ণুতা। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের এই সহনশীলতা ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে। সেই অর্জিত গণতন্ত্রকে রক্ষা করার পাশাপাশি এর প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বাংলাদেশে ‘সমঝোতার রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
দেশে ধর্মীয় বিভেদ না বাড়িয়ে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান রাষ্ট্রপতি। তার ভাষায়, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান কেউ যেন বিভেদের শিকার না হন। সবাইকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে নিজ নিজ অধিকার নিয়ে একসঙ্গে বসবাসের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ
নিজ জেলার উন্নয়ন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ঠাকুরগাঁও দীর্ঘদিন ধরে দেশের পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর একটি। এখানকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে দাবি ছিল, সেটি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি নির্ধারণ হয়েছে। সোমবার এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা রয়েছে। এতে জেলার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি। জায়গা নির্ধারণসহ প্রাথমিক কাজ এগিয়েছে এবং আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ভুল্লী ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবিও পূরণ হয়েছে বলে জানান মির্জা ফখরুল। দুই এলাকাকে উপজেলা হিসেবে ভাগ করার পর প্রশাসনিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিমানবন্দর টিকিয়ে রাখতে বাড়াতে হবে শিল্প
ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর চালুর দাবি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, এটি চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত মানুষের জন্য যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে। তবে বিমানবন্দরকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে হলে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে বর্তমানে পর্যাপ্ত কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান নেই। ফলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। এ পরিস্থিতি বদলাতে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল জানান, অর্থ উপদেষ্টা ও বাণিজ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঠাকুরগাঁও পরিদর্শন করে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। শিগগিরই বিনিয়োগকারীদের এখানে আনার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চীনের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তার ভাষ্য, চীনা রাষ্ট্রদূতকে ঠাকুরগাঁওয়ে আনা হয়েছিল এবং জেলার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের চীন সফরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে চীন থেকে বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগকারীরা এসে স্থানীয় কৃষিকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ে তুলতে সহযোগিতা করতে পারেন।
তরুণদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আহ্বান
যুবসমাজের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু চাকরি কিংবা ঠিকাদারির পেছনে না ছুটে তরুণদের নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
‘ঘরের ছেলে’কে ঘিরে উৎসবের আমেজ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো রোববার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে দুপুরের দিকে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামের হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন তিনি।
পরে জেলা সার্কিট হাউজে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সেখান থেকে সেনুয়া কবরস্থানে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন রাষ্ট্রপতি। পথে সড়কের দুই পাশে অপেক্ষমাণ সাধারণ মানুষের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন তিনি।
বিকেলে ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহাসিক বড় মাঠে তার সম্মানে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সংবর্ধনা শুরুর আগে হঠাৎ শহরজুড়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পাশাপাশি শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়াতেও অনুষ্ঠানে মানুষের উপস্থিতি ও উৎসাহে ভাটা পড়েনি।
রাষ্ট্রপতির আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো ঠাকুরগাঁওজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। শহরের প্রধান সড়ক, প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় সাজানো হয় ব্যানার, ফেস্টুন, তোরণ ও আলোকসজ্জায়।
রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে জেলাজুড়ে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনুষ্ঠানস্থল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং রাষ্ট্রপতির চলাচলের পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।
সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতির।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে মির্জা ফখরুলকে ঘিরে স্থানীয়দের আবেগও ছিল দৃশ্যমান। একসময়কার পরিচিত ‘ঘরের ছেলে’কে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দেখে গর্বিত জেলার মানুষ—আর তার সফরকে ঘিরে সেই আবেগই যেন রূপ নেয় জনসমাগম ও উৎসবের আমেজে।