একটি শিশু সকালে স্কুলে গেল। বই-খাতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে বসেছে। শিক্ষক পাঠ দিচ্ছেন। হঠাৎ ভূমিকম্প হলো, আগুন লাগল, কিংবা বন্যার পানি দ্রুত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকতে শুরু করল। সেই মুহূর্তে শিশুটি কী করবে? কোথায় যাবে? কোন পথ দিয়ে বের হবে? কাকে অনুসরণ করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দুর্যোগের মুহূর্তে খোঁজার সময় নেই। উত্তরটি জানতে হবে তার আগেই।
বাংলাদেশে দুর্যোগ আমাদের বাস্তবতার অংশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাত, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার মতো নানা ঝুঁকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে মোকাবিলা করতে হয়। তাই একটি বিদ্যালয়কে শুধু পাঠদানের উপযুক্ত করে তুললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বিদ্যালয়কে হতে হবে দুর্যোগ-সহনশীল, নিরাপদ এবং প্রস্তুত একটি প্রতিষ্ঠান।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর প্রথম শর্ত হলো-বিদ্যালয়টি কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তা আগে বুঝতে হবে। উপকূলীয় এলাকার বিদ্যালয়ের ঝুঁকি আর পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকি এক নয়। হাওর এলাকার বিদ্যালয়ের ঝুঁকি আবার শহরের বিদ্যালয়ের চেয়ে আলাদা। তাই সব বিদ্যালয়ের জন্য একই ধরনের প্রস্তুতি না নিয়ে স্থানীয় ঝুঁকি অনুযায়ী বিদ্যালয়ভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।
প্রথম কাজ: বিদ্যালয়ের ঝুঁকি চিহ্নিত করা
প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বিদ্যালয়ের একটি সহজ ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে। কোথায় পানি জমে, কোন রাস্তা বর্ষায় বিচ্ছিন্ন হয়, কোথায় বৈদ্যুতিক তার ঝুঁকিপূর্ণ, বিদ্যালয়ের কোন অংশ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, কোথায় জরুরি অবস্থায় সবাই জড়ো হতে পারবে-এসব চিহ্নিত করা দরকার। এই কাজের জন্য বড় কোনো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা সবসময় প্রয়োজন হবে না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেও প্রাথমিক ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয় কাজ: বিদ্যালয়ের নিজস্ব দুর্যোগ পরিকল্পনা
প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি সংক্ষিপ্ত School Disaster Preparedness Plan থাকা দরকার। সেখানে দুর্যোগের আগে, দুর্যোগের সময় এবং দুর্যোগের পরে কী করা হবে, তা পরিষ্কারভাবে লেখা থাকবে। কে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবেন? কে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন? কে প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্ব নেবেন? জরুরি অবস্থায় বিদ্যালয়ের কোন দরজা ব্যবহার করা হবে? শিশুদের গণনা কীভাবে করা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই নির্ধারিত থাকলে দুর্যোগের সময় বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তৃতীয় কাজ: নিয়মিত দুর্যোগ মহড়া
দুর্যোগ প্রস্তুতির সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি হলো অনুশীলন। একটি শিশু বই পড়ে হয়তো জানতে পারে ভূমিকম্পের সময় কী করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে মাটি কাঁপলে সে আতঙ্কিত হতে পারে। তাই নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে তাকে অভ্যাস করাতে হবে।
ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে নিরাপদ অবস্থান নেওয়া, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে দ্রুত বের হওয়ার পথ ব্যবহার করা, বন্যার ক্ষেত্রে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার অনুশীলন-এসব বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হতে পারে। তবে মহড়া যেন শুধু ছবি তোলা বা প্রতিবেদন তৈরির আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না হয়। প্রতিটি মহড়ার শেষে কী ভুল হয়েছে, কী উন্নতি করা দরকার-তা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আলোচনা করা উচিত।
চতুর্থ কাজ: শিক্ষককে প্রস্তুত করা
দুর্যোগের সময় শিশুর সবচেয়ে বড় ভরসা তার শিক্ষক। তাই বিদ্যালয়ের দুর্যোগ প্রস্তুতির কেন্দ্রে শিক্ষককে রাখতে হবে।
শিক্ষকদের জানতে হবে কীভাবে আতঙ্কিত শিশুদের শান্ত করতে হয়, কীভাবে নিরাপদে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নিতে হয়, কীভাবে উপস্থিতি যাচাই করতে হয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। শিক্ষকদের প্রাথমিক চিকিৎসা, অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্প প্রস্তুতি, বন্যা ও অন্যান্য স্থানীয় ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক দুর্যোগের সময় শুধু শিক্ষক নন; তিনি হয়ে ওঠেন একজন প্রথম সারির নিরাপত্তা-সহায়ক।
পঞ্চম কাজ: শিশুকে ভয় নয়, দক্ষতা শেখাতে হবে
দুর্যোগ শিক্ষা দিতে গিয়ে শিশুদের ভয় দেখানো যাবে না। বরং তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে। ‘ভূমিকম্প হলে সবকিছু ভেঙে পড়বে’-এ ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাষার পরিবর্তে শেখাতে হবে, ‘ভূমিকম্প হলে শান্ত থাকতে হবে, নিরাপদ অবস্থান নিতে হবে এবং শিক্ষকের নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে।’
গল্প, ছবি, কুইজ, অভিনয়, গান, নাটক ও খেলাধুলার মাধ্যমে দুর্যোগ শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। এতে শিশু বিষয়গুলো আনন্দের সঙ্গে শিখবে এবং প্রয়োজনের সময় মনে করতে পারবে।
ষষ্ঠ কাজ: বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নিরাপদ করা
দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে অবকাঠামোর নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ের ভবন, ছাদ, দেয়াল, সিঁড়ি, বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানির ব্যবস্থা, টয়লেট, গেট ও খেলার মাঠ নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। জরুরি বহির্গমন পথ যেন বাধামুক্ত থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ের আসবাব এমনভাবে রাখা উচিত, যাতে জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার পথ বন্ধ না হয়। অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। অর্থাৎ, নিরাপদ বিদ্যালয় মানে শুধু শক্ত ভবন নয়; নিরাপদ ব্যবহারের উপযোগী পুরো পরিবেশ।
সপ্তম কাজ: পরিবারকে যুক্ত করা
একটি শিশু বিদ্যালয়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি শিখল, কিন্তু বাড়িতে তার পরিবার কিছুই জানল না-তাহলে প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবারে সহজ কিছু বার্তা দেওয়া যেতে পারে। যেমন-জরুরি যোগাযোগের নম্বর সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিরাপদে রাখা, জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা, স্থানীয় সতর্কবার্তা অনুসরণ করা এবং দুর্যোগের সময় গুজব এড়িয়ে চলা। বিদ্যালয় বছরে অন্তত একবার অভিভাবকদের নিয়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক আলোচনা করতে পারে।
অষ্টম কাজ: স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিতে হবে
একটি বিদ্যালয় একা দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারে না। স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্যকর্মী, জনপ্রতিনিধি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিদ্যালয়ের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। দুর্যোগের সময় কে কী সহায়তা করবে, তা আগে থেকে জানা থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে সময় নষ্ট হবে না।
নবম কাজ: আগাম সতর্কবার্তা শিশুবান্ধব করতে হবে
দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সতর্কবার্তা শুধু পাওয়া নয়, সেটি বোঝাও জরুরি। ‘বিপদ সংকেত জারি হয়েছে’-এটি শিশুর কাছে অনেক সময় অস্পষ্ট হতে পারে। তাকে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলতে হবে-কী ধরনের বিপদ, কখন হতে পারে, কোথায় নিরাপদে যেতে হবে এবং কী করা যাবে না।
বিদ্যালয়ে এমন একটি ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে সরকারি সতর্কবার্তা দ্রুত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে পৌঁছায়।
দশম কাজ: দুর্যোগের পরও শিক্ষাকে চালু রাখার পরিকল্পনা
দুর্যোগের কারণে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে শিশুর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। তাই দুর্যোগ প্রস্তুতির মধ্যে Learning Continuity বা শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষার পরিকল্পনাও থাকা দরকার। বিদ্যালয় ভবন ব্যবহার করা না গেলে কোথায় অস্থায়ীভাবে পাঠদান করা যাবে, কীভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হবে, কীভাবে শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হবে-এসব বিষয় আগে থেকেই ভাবা যেতে পারে। কারণ দুর্যোগের পর শিশুদের শুধু নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়; তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
শেষ কথা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য সবকিছুর আগে প্রয়োজন একটি মানসিক পরিবর্তন। আমাদের ভাবতে হবে-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কোনো অতিরিক্ত কাজ নয়; এটি বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও শিক্ষারই একটি অংশ। একটি নিরাপদ বিদ্যালয় হলো এমন একটি বিদ্যালয়, যেখানে ভবন নিরাপদ, শিক্ষক প্রস্তুত, শিশু সচেতন, পরিবার সম্পৃক্ত এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ রয়েছে।
দুর্যোগের সময় কী করতে হবে, তা তখন শেখানোর সুযোগ নেই। তাই প্রস্তুতি নিতে হবে শান্ত সময়ে। আমাদের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি নিজ নিজ এলাকার ঝুঁকি বুঝে পরিকল্পনা তৈরি করে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়, মহড়া পরিচালনা করে, পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষার ব্যবস্থা রাখে-তাহলে দুর্যোগের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের শিশুদের দুর্যোগের শিকার হিসেবে নয়, দুর্যোগ-সচেতন ও সক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কারণ একটি দুর্যোগ-প্রস্তুত শিশু শুধু নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; সে তার পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে ওঠে।
দুর্যোগ আসবে কি না-তা সবসময় আমাদের হাতে নেই। কিন্তু দুর্যোগ এলে আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব-সেটি অনেকটাই আমাদের হাতে। তাই এখনই সময়-প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, নিরাপত্তা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিরও কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার।