প্রশাসনে সংস্কার জোরদার, বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক পদক্ষেপ
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক, নিরপেক্ষ ও কার্যকর করতে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে সরকার। সরকারি সূত্রগুলোর দাবি, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে আইন ও বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগও চলমান রয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে অতীতের জাতীয় নির্বাচন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে।
৩২ যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসর
সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকারী ৩২ জন বর্তমান যুগ্ম সচিবকে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকারি সূত্রের ভাষ্য, এটি চলমান প্রশাসনিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অংশ। এর আগে একই ধরনের সিদ্ধান্তে আরও ২২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। পাশাপাশি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী বিভিন্ন কর্মকর্তার ভূমিকা পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য
গত মাসে সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেন, বিগত সরকারের আমলে প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকারী এবং রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টার ব্যাখ্যা
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোথাও উল্লেখ করেনি যে নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের কারণে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী চাকরির নির্ধারিত সময় পূর্ণ হলে জনস্বার্থে কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে সেই বিধানই প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
পুলিশ প্রশাসনেও পুনর্বিন্যাস
প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতেও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস অব্যাহত রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন ধাপে তিনজন ডিআইজি, একাধিক অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপারসহ মোট ৮০ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী করতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পুরোনো আলোচিত মামলাতেও অগ্রগতি
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত কয়েকটি মামলার তদন্তেও নতুন অগ্রগতির তথ্য জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এছাড়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনায় বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়ার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় সহিংসতার অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছেন।
সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত
সরকার-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রশাসনিক পুনর্গঠন কেবল কর্মকর্তাদের বদলি বা অবসরে পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ করে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।