নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিয়ে চার দিনের সফর শেষে দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সফরে ১১টি দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, সাধারণ পরিষদে ভাষণ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন শুক্রবার নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৩টা) জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী চার দিনে মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এ ছাড়া তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ সরকারি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আরও প্রায় ৫০টি কর্মসূচিতে অংশ নেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৮০টি আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা হয়।
সাতটি বক্তব্য, একটি সাধারণ পরিষদে
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন বলে জানান মাহদী আমিন। এর মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে একটি ভাষণ, উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ববৈঠকে চারটি, বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে একটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি বক্তব্য ছিল।
জাতিসংঘের মূল অধিবেশনকেন্দ্রিক আটটি কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে ছিল সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য, জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রাতরাশ অনুষ্ঠান ও উদ্বোধনী অধিবেশন। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও স্ত্রীকে নিয়ে যোগ দেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, রোহিঙ্গা সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আয়োজিত চারটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব কর্মসূচিতেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট এবং ধাত্রী বা মিডওয়াইফের সংখ্যা বৃদ্ধিবিষয়ক দুটি আয়োজন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে করে।
১১ দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
সফরে মালদ্বীপ, ভুটান, হাইতি, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনায় জনশক্তি রপ্তানি, নতুন কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্ব পায়।
মাহদী আমিন জানান, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়।
এ ছাড়া বোয়িং গ্লোবাল, গেটস ফাউন্ডেশন, ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারী, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউট এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা
সফরের শেষ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। জেপি মরগান চেস আয়োজিত ‘ব্রেকফাস্ট মিটিং উইথ ওয়াল স্ট্রিট’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে প্রায় ২০টি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশের বিশেষ করে আর্থিক খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। সংস্থাটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছে বলে জানান মুখপাত্র।
মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। মাহদী আমিন জানান, অতীতে গুম, খুন, হামলা, মামলা ও বাকস্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে ভূমিকার জন্য হাইকমিশনারকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান।
বৈঠকে বাংলাদেশের মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয় বলে জানান তিনি।
আট কর্মসূচিতে ডা. জুবাইদা রহমান
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরে আটটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে চারটিতে বক্তব্য দেন তিনি।
জাতিসংঘের নারী নেত্রীদের প্ল্যাটফর্মের বার্ষিক অধিবেশন, বিশ্ব ফার্স্ট স্পাউস সংলাপ এবং মাতৃমৃত্যু হ্রাসে মিডওয়াইফারি-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ডা. জুবাইদা রহমান। এসব আয়োজনে তাঁর বক্তব্য প্রশংসিত হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। সফরকালে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গেও কুশল বিনিময় করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের আমন্ত্রণ
সফরের শেষ পর্যায়ে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
মাহদী আমিন জানান, তিনটি দেশ থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈঠকগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি ও খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে যৌথ বিনিয়োগের বিষয় আলোচনায় আসে।
ক্যালিফোর্নিয়া যাবে ছোট প্রতিনিধিদল
যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরছেন। তাঁর নির্দেশনায় সরকারি প্রতিনিধিদলের একটি ছোট অংশ পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে ক্যালিফোর্নিয়া যাবে বলে জানান মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি বিশ্বে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবতা প্রতিষ্ঠার বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এ সফরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং ও জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রূপক/ 26.09.26