বারবার খুলেছে, বারবার বন্ধও হয়েছে। আর প্রতিবারই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে ঘিরে সামনে এসেছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়মের নানা অভিযোগ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগের খবরের মধ্যে নতুন করে উঠছে সেই পুরোনো প্রশ্ন এবারও কি সুযোগ পাবে সীমিতসংখ্যক এজেন্সির একটি গোষ্ঠী?
এবার মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মূল এজেন্সি হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে প্রকাশিত তালিকা নিয়ে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অতীত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, তালিকায় এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যাদের মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই কিংবা নির্ধারিত কিছু শর্ত পূরণের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ।
মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া শর্তগুলোর মধ্যে পাঁচ বছরের রিক্রুটিং অভিজ্ঞতা এবং গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার কর্মী বিদেশে পাঠানোর মতো বিষয় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু নতুন তালিকার ২৫টি এজেন্সির মধ্যে ১৭টির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। অন্য ৮টি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানো কর্মীর সংখ্যা ১ হাজার ৬১২ জন। তাদের মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পাঠানো কর্মীর সংখ্যা একেবারেই কম।
এ ছাড়া সাতটি এজেন্সির বিদেশে কর্মী পাঠানোর মোট সংখ্যা ৩ হাজারের নিচে বলে তথ্য উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিতভাবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা ৮ হাজার ২৬০ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ ৮০৯, আল হায়াত ওভারসিজ ৪০৪, ভালুকা ওভারসিজ ২৩৫, ব্রাদার ট্রেডিং অ্যান্ড কনট্রাকটিং ১ হাজার ৪৫৬, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট ২ হাজার ৫৫৬, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ ২ হাজার ৮২৯ এবং দি অ্যাংকর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট ৩৭১ জন কর্মী পাঠিয়েছে বলে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
আগের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়
তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দেনদরবারের পর ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হলে মাত্র ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সে সময় সরকার নির্ধারিত ব্যয় ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকা হলেও কর্মীদের কাছ থেকে ২ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে বাজারটি আবার চালু হলে প্রথমে ২৫টি এবং পরে ধাপে ধাপে ১০০টির বেশি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়। ওই সময়ও অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। একটি গবেষণায় প্রতি কর্মীর গড় অভিবাসন ব্যয় ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে একাধিক মামলাও করা হয়।
২৫ এজেন্সিকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন
নতুন ব্যবস্থায় ২৫টি মূল এজেন্সির অধীনে ১০টি করে মোট ২৫০টি সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি রাখার কথা রয়েছে। পাশাপাশি বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সিসহ মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল এজেন্সির মাধ্যমে চাহিদাপত্র প্রক্রিয়াকরণ করতে হলে অতিরিক্ত প্রসেসিং ফি দিতে হতে পারে। এতে কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন তালিকার ২৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা নেই। তালিকাভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, অন্বেষা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আর্থ স্মার্ট বাংলাদেশ, খান জাহান আলী ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, গডনেস সার্ভিসেস, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ, সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিংক, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ভেলী ট্রেড ও আত তাকওয়া।
মানব পাচারের অভিযোগ থাকা এজেন্সি নিয়েও প্রশ্ন
নতুন তালিকায় থাকা কয়েকটি এজেন্সির বিরুদ্ধে অতীতে মানব পাচারসহ অনিয়মের অভিযোগের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রিফা ইন্টারন্যাশনাল, জেনারেল ট্রেডিং, গডনেস সার্ভিস লিমিটেড ও ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নাম রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার শর্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছিল কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচার, শ্রম আইন লঙ্ঘন, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, অর্থ পাচার বা অনৈতিক অভিবাসন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড থাকা যাবে না। অথচ এসব অভিযোগের তদন্তে সংশ্লিষ্ট চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসায় নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সরকারের অবস্থান কী?
নতুন তালিকা ও অনুমোদনের বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান খান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো নির্দেশনা বা চিঠি আসেনি এবং তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অতীতের অভিজ্ঞতা, নতুন ২৫ এজেন্সির যোগ্যতা এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সব মিলিয়ে এবার কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।