ডাকবাক্সে চিঠি ফেলার সেই পুরোনো দিনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগও। এখন আর শুধু চিঠি, নথি কিংবা ছোট পার্সেল নয়—ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, আলমারি, টেলিভিশন এমনকি এয়ার কন্ডিশনারের মতো ভারী পণ্যও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ডাক বিভাগের মাধ্যমে। নতুন এই স্পিড পোস্ট সেবায় মাত্র দুই মাসে প্রায় ৪০০ টন পণ্য পরিবহন হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, দেশের প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ নয়—এমন বিভিন্ন ধরনের পণ্য এখন ডাক বিভাগের পরিবহন ব্যবস্থায় পাঠানো যাচ্ছে। ডাক বিভাগের গাড়িতে পণ্য ওঠানো-নামানোর পাশাপাশি নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন পোস্টম্যানরা। পরীক্ষামূলকভাবে ইতোমধ্যে কয়েকটি মোটরসাইকেলও ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে।
শুধু মোটরসাইকেল নয়, ফ্রিজ, আলমারি ও ওয়ারড্রবের মতো বড় আকারের আসবাবও যাচ্ছে স্পিড পোস্টে। শিক্ষার্থীদের কাঁথা-বালিশ ও বিছানাপত্র পাঠানোর সুবিধাও মিলছে এ সেবায়। রান্নাঘরের বিভিন্ন সামগ্রী, প্রেসার কুকার, ইন্ডাকশন চুলা, এলইডি টিভি, এয়ার কন্ডিশনার, বাইসাইকেল এবং কীটনাশক স্প্রে করার যন্ত্রও পরিবহন করা হচ্ছে।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমি ফলসহ গত দুই মাসে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। ডাক বিভাগের ইতিহাসে এত বিপুল পরিমাণ পণ্য এভাবে পরিবহনের নজির আগে ছিল না বলেও জানান তিনি।
কেজিপ্রতি মাশুল কত?
স্পিড পোস্ট সেবার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো কম খরচ। প্রথম এক কেজি পণ্যের জন্য মাশুল ১০ টাকা। এরপর অতিরিক্ত প্রতিটি কেজির জন্য দিতে হবে মাত্র ৫ টাকা করে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গ্রাহকদের সুবিধার জন্য অনলাইন মাশুল ক্যালকুলেটরও চালু করেছে ডাক বিভাগ। এতে পণ্য পাঠানোর আগেই সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়।
বর্তমানে ঢাকার জিপিও ছাড়াও গুলশান, বনানী, মিরপুর ও উত্তরাসহ কয়েকটি সাব-পোস্ট অফিস থেকে সরাসরি স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্সেল পাঠানোর জন্য রয়েছে বৈদেশিক ইএমএস সেবাও।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিলির বাধ্যবাধকতা
স্পিড পোস্টের কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল করতে পণ্য বিলির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেছে ডাক অধিদপ্তর। জেলা শহর থেকে ঢাকায় পাঠানো পণ্য সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা এবং প্রত্যন্ত বা দুর্গম এলাকায় সর্বোচ্চ ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে বিলির জন্য প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কিছু পণ্য এ সেবার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক বা দাহ্য পদার্থ, বিপজ্জনক রাসায়নিক, মাদকদ্রব্য, জীবন্ত প্রাণী, আগ্নেয়াস্ত্র এবং ভরা বা খালি গ্যাস সিলিন্ডার স্পিড পোস্টে পাঠানো নিষিদ্ধ।
নির্বাচনে আস্থা, পরে বাড়ল জনপ্রিয়তা
ডাক বিভাগের সেবার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরিতে সাম্প্রতিক পোস্টাল ভোটের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম।
তিনি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন। ভোট প্রদান থেকে শুরু করে ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে প্রবাসী ভোটাররা বার্তার মাধ্যমে অগ্রগতি জানতে পেরেছেন। এতে ডাক বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানুষের মুখে মুখে স্পিড পোস্টের প্রচার ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা নিজেদের প্রয়োজনেই এ সেবা ব্যবহার করে এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছেন বলে জানান তিনি।
ভবিষ্যতে বাসাবদলের পণ্যও যাবে ডাকযোগে?
স্পিড পোস্টের জনপ্রিয়তা ডাক বিভাগের সামনে আরও বড় পরিসরে সেবা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মহাপরিচালক জানান, সম্প্রতি এক গ্রাহক এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বাসা পরিবর্তনের সময় পুরো বাসার আসবাব ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠানোর আগ্রহ দেখিয়েছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডাক বিভাগে আন্তঃজেলা বাসাবদলসহ এ ধরনের সেবা চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। এ জন্য ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব একটি প্রকল্পের আওতায় ৫০টি বৈদ্যুতিক বাইক সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব যান গ্রিন এনার্জিতে পরিচালিত হবে বলে জানান মহাপরিচালক।
বদলে যাচ্ছে ডাক বিভাগের মেইল ব্যবস্থাপনাও
স্পিড পোস্টের পাশাপাশি ডাক বিভাগের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেইল প্রসেসিং সেন্টারকে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।
এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসা মেইল, ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়া মেইল এবং রাজধানীর অভ্যন্তরীণ মেইল—সবই একটি কেন্দ্র থেকে প্রক্রিয়াজাত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, কমলাপুরের রেলওয়ে মেইল সার্ভিসের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ায় সেখানে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে। এ কারণে ঢাকা জিপিও ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ করে সেখানে বিদেশ থেকে আসা ও বিদেশে পাঠানো পার্সেল ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষায়িত ব্যবস্থার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তেজগাঁও, কমলাপুর ও জিপিওকে কেন্দ্র করে তিনটি হাবের সমন্বয়ে ভবিষ্যতে ডাক বিভাগের মেইল ব্যবস্থাপনা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডাক বিভাগের কাছে শুধু মুনাফা অর্জনই মূল লক্ষ্য নয়। কম খরচে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সেবা দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকেও একটি কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থার আওতায় আনা—এটাই স্পিড পোস্টের বড় সাফল্য।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্পিড পোস্ট সেবা চালু করা হয়। শুরুতে মৌসুমি ফল পরিবহনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও চাহিদা বাড়ায় এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় বড় আকারের পণ্য পরিবহনের সুযোগও যুক্ত হয়েছে।