প্রভাবশালীর দখলে সরকারি বন্দোবস্তের জমি, আশ্রয়হীন বাবুলাল
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় সরকারি বন্দোবস্ত পাওয়া ১৬ কাঠা জমি ৩৬ বছরেও বুঝে পাননি ভূমিহীন বাবুলাল টুডু। অভিযোগ, বন্দোবস্ত পাওয়ার পরই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জমিটি দখল করে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। নিজের জমি ফিরে পেতে প্রশাসনের কাছে একাধিকবার আবেদন করেও এখনো সমাধান পাননি তিনি।
বাবুলাল টুডু সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁর বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার মহালাল গ্রামে। অন্যদিকে, তাঁর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া জমি রয়েছে উপজেলার চাত্রাপুকুর গ্রামে। বর্তমানে ওই জমিতে দুটি বাড়ি রয়েছে। এর একটি দোতলা ও অন্যটি একতলা। অভিযোগ, বাড়ি দুটিতে বসবাস করছেন অন্যরা।
নিজের জমি না থাকায় বাবুলালের সাত সদস্যের পরিবার এখন এক আত্মীয়ের জমিতে ছোট তিনটি মাটির ঘরে বসবাস করছে।
বাবুলাল জানান, প্রায় ৩৬ বছর আগে সরকার তাঁকে ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য ১৬ কাঠা জমি বন্দোবস্ত দেয়। তবে তিনি জমিতে যাওয়ার আগেই সেখানে অন্যরা বাড়ি নির্মাণ করে দখলে নেন।
তিনি বলেন, “আমার নিজের কোনো জমি নেই। সরকার ঘরবাড়ি করার জন্য জমিটি দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগেই অন্যরা বাড়ি করে নেয়। ১৬ কাঠা জমি থাকার পরও আমাকে অন্যের জমিতে থাকতে হচ্ছে। আমি নিজের জমি ফিরে পেতে চাই।”
তদন্তে জমি বাবুলালের নামে থাকার তথ্য
জমি ফিরে পেতে ২০২৩ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন বাবুলাল। ওই আবেদনের পর ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর গোদাগাড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহিদ হাসান জেলা প্রশাসকের কাছে একটি তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গোদাগাড়ীর চাত্রাপুকুর গ্রামের ১৩৭ নম্বর নন্দাপুর মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ২৯৮ নম্বর দাগের শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ জমি বাবুলাল টুডুর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় তাঁর নামে কবুলিয়ত দলিল রেজিস্ট্রি করার আদেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
তবে এরপরও জমিটির দখল বুঝে পাননি বাবুলাল। গত বছর তিনি আবারও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। পরে বিষয়টি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
সরেজমিনে গিয়ে যা দেখল প্রশাসন
বাবুলালের অভিযোগের পর বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করতে গত ৯ আগস্ট একজন সার্ভেয়ারকে নন্দাপুরে পাঠান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। সার্ভেয়ার নকশা যাচাই করে দেখতে পান, বাবুলালের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া ২৯৮ নম্বর দাগের দক্ষিণ পাশে শহিদুল ইসলামের বাড়ি। এর উত্তরে কিছুটা ফাঁকা জায়গার পর রয়েছে বেনজিন রহমান সুমনের বাড়ি।
সরেজমিন পরিদর্শনের সময় বাবুলাল ও তাঁর ছেলে সুধীর টুডুও উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সার্ভেয়ারের সঙ্গে তাঁদের দেখে দুই বাড়ির নারীরা ক্ষুব্ধ হন বলে জানা গেছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সার্ভেয়ার নাজমুল হাসান বলেন, নকশা অনুযায়ী ২৯৮ নম্বর দাগের জমিটি বাবুলাল টুডুর। বন্দোবস্তের পর থেকে জমিটি তাঁর নামেই রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে অন্যদের দখল রয়েছে।
খতিয়ান দেখিয়ে দাবি, নকশায় মিলল ভিন্ন তথ্য
বেনজিন রহমান সুমন বাড়িতে না থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর চাচা হারুন-অর-রশিদ একটি খতিয়ান দেখিয়ে দাবি করেন, জমিটি তাঁর বাবা আমিনউদ্দীনের।
এ সময় সার্ভেয়ার নকশা ও খতিয়ান যাচাই করে জানান, আমিনউদ্দীনের জমি রয়েছে ২৯৭ নম্বর দাগে। অথচ সংশ্লিষ্ট বাড়িটি ২৯৮ নম্বর দাগের জমিতে, যে দাগের জমি বাবুলাল টুডুর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সুমনের বাড়ির উত্তর পাশে আরও কিছু খাসজমি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। ওই অংশের উত্তর প্রান্তে বলরাম কর্মকারের বাড়ি। বলরামের স্ত্রী কল্পনা রানীর অভিযোগ, তাঁদের বাড়িসহ ফাঁকা জমিটিও দখলের চেষ্টা করছেন বেনজিন রহমান সুমন। এ নিয়ে তাঁদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অবৈধ দখল হলে উচ্ছেদের আশ্বাস
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুল ইসলাম বলেন, সার্ভেয়ারের প্রতিবেদন এখনো তাঁর হাতে পৌঁছেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বাবুলালের জমিতে অন্য কারও বাড়ি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নিয়ে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে জমিটি বাবুলাল টুডুকে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে নিজের নামে বন্দোবস্ত পাওয়া জমির দখল না পাওয়ার ঘটনায় এখন প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন বাবুলাল ও তাঁর পরিবার।