অবৈধ হলেও থামছে না ‘বাংলা টেসলা’, নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন পরিকল্পনা
রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনের দীর্ঘদিনের সংকটের সুযোগে দ্রুত বিস্তার ঘটেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার, যা অনেকের কাছে ‘বাংলা টেসলা’ নামে পরিচিত। আইনগত স্বীকৃতি না থাকলেও শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক-সবখানেই এখন এ যানবাহনের দাপট দেখা যাচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান এই পরিবহনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর ঢাকায় গণপরিবহনের চাহিদার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা এখনও অপর্যাপ্ত। রাজধানীর ১১০টি সক্রিয় রুটে ৭ হাজার ৪৩টির বেশি বাস ও মিনিবাস চলাচলের অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে সড়কে নামে প্রায় সাড়ে চার হাজার যানবাহন। ফলে যাত্রীসেবায় বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
এই শূন্যস্থান পূরণে গত কয়েক বছরে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। নগর পরিকল্পনাবিদদের ধারণা, বর্তমানে দেশে এ ধরনের যানবাহনের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখের মধ্যে পৌঁছেছে, যার বড় একটি অংশ রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় চলাচল করছে। যদিও এসব অটোরিকশার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবুও এ খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। যানবাহন উৎপাদন, ব্যাটারি সরবরাহ, চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ, মেরামত ও কিস্তিভিত্তিক বিক্রিসহ নানা কার্যক্রমে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে প্রায় ৭০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে এবং প্রতিটি যানবাহনের সঙ্গে কয়েকজন মানুষের জীবিকা জড়িত। ফলে হঠাৎ করে এ পরিবহন বন্ধ করা হলে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে গাড়ি চালানো এবং অদক্ষ চালকের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে যাত্রী ও পথচারী উভয়েই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা একেবারে বন্ধ না করে ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা উচিত। এজন্য চালকদের প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন এবং কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ব্যাটারি উৎপাদন, চার্জিং অবকাঠামো ও বিভিন্ন সহায়ক খাত গড়ে উঠেছে। ফলে বিষয়টি শুধু পরিবহন নয়, বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাপক হারে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ব্যবস্থাপনাকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনতে কাজ করছে সরকার। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ যানবাহনের নিবন্ধন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।