জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সংরক্ষণে থাকা মিরপুরের আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্লটের মূল নথি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এসব প্লটে রয়েছে বহুতল ভবন। জমি ও ভবনের বর্তমান মূল্য বিবেচনায় প্রতিটি সম্পদের আনুমানিক মূল্য ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা। ফলে হারিয়ে যাওয়া নথিগুলোর সঙ্গে প্রায় ১২০ কোটি টাকার সম্পদের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন জড়িয়ে পড়েছে।
গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ নথির মধ্যে মিরপুর সেকশন-১২-এর বি ব্লকের ১১ নম্বর রোডের ২০১ নম্বর, ১২ নম্বর রোডের ২২৩ নম্বর, ৭ নম্বর রোডের ১১৫ নম্বর এবং ৬ নম্বর রোডের ৯৩ নম্বর প্লট রয়েছে। একই এলাকার সি ব্লকের ১৬ নম্বর লেনের ১৭ নম্বর প্লট, সেকশন-১০-এর সি ব্লকের ১৪ নম্বর রোডের ৮/১ ও ৮/২ নম্বর প্লট এবং সেকশন-১২-এর ডি ব্লকের ২৫ নম্বর লেনের ১৭ ও ১৯ নম্বর প্লটের নথিও পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংস্থাটির নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এর মধ্যে ৮/১ নম্বর প্লটটি পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতাভুক্ত। অন্যগুলো বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্লটগুলোর আয়তন তিন থেকে পাঁচ কাঠার মধ্যে। কোনো কোনো জায়গায় ৯-১০ তলা ভবন রয়েছে, আবার কিছু প্লটে তিন থেকে চারতলা ভবনও নির্মিত হয়েছে।
গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ নথি নিয়ে অনুসন্ধানে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি অসাধু চক্র নথি সরিয়ে নেওয়া, জাল কাগজপত্র তৈরি এবং মালিকানা বা বরাদ্দের তথ্য পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত। অতীতেও এ ধরনের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
### ২০২০ সালে রেকর্ডরুম থেকে নথি নেওয়ার তথ্য
গৃহায়নের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন অফিস সহকারী মালেকিন নাছির রেকর্ডরুম থেকে সংশ্লিষ্ট প্লটগুলোর নথি নেন। পরে নথিগুলো রেকর্ডরুমে ফেরত দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। রেকর্ডরুমে অনুসন্ধান করেও সেগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নথির গতিবিধি রেজিস্টারে দেখা যায়, ২০২০ সালের ৭ অক্টোবর নথিটি ইস্যু শাখায় এন্ট্রির জন্য পাঠানো হয়েছিল। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর জারি করা এক পত্রে জানানো হয়, নথির সন্ধান অব্যাহত রয়েছে এবং মূল নথি পাওয়া গেলে তা সংশ্লিষ্ট ফাইলে সংযুক্ত করা হবে।
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি তদন্ত কমিটি গঠন করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি ভূমি উইংয়ের অরক্ষিত ও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এমন নথির বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সংশ্লিষ্ট প্লটগুলোর মূল নথি পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানানো হয়। নথি উদ্ধারে তল্লাশি চালানোর জন্য নোটিশও জারি করা হয়।
### নথি জালিয়াতির অভিযোগে একাধিক ঘটনা
গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন নথি ও অভিযোগে আরও কিছু অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে মিরপুর রূপনগর আবাসিক এলাকার ১৯/২ নম্বর সড়কের ৯/১ নম্বর পুনর্বাসন প্লটের নথি জাল করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে কাগজপত্র তৈরি এবং আমমোক্তার দলিল নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়।
মিরপুর-২ এলাকার এভি-২-এর ১ নম্বর প্লট নিয়েও জাল কাগজ তৈরির অভিযোগ রয়েছে। সেখানে রোকেয়া খাতুনের নামে ভুয়া বাস্তব দখলের স্মারক দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। অথচ নথি অনুযায়ী প্রকৃত মালিক করিমা খাতুন গং।
এ ছাড়া সেকশন-২, ব্লক-এফের ২ নম্বর প্লট নিয়েও মালিকানা পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। নথি অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে প্লটটি শহিদুল্লাহ গংদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা প্লটটি বুঝে না পাওয়ায় ১৯৮৪ সালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুপারিশে মিরপুর সেকশন-১২-এর ৫-১৬৯ নম্বর প্লট বিকল্প হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর আগের প্লটটি খালি থাকার সুযোগে জালিয়াতির মাধ্যমে ‘ফৌজি আলী’র নামে বরাদ্দ দেখানোর অভিযোগ ওঠে। অথচ ফৌজি আলী একই এলাকার অন্য একটি প্লটের বরাদ্দগ্রহীতা ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
### বাস্তব দখল নিয়ে ভুক্তভোগীর অভিযোগ
মিরপুর সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকার সেকশন-৮, ব্লক-ক, ৭ নম্বর সড়কের ৩০ নম্বর প্লটের বরাদ্দগ্রহীতা ইসলামা বেগমও কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া আবেদনে তিনি জানান, বরাদ্দের শর্ত অনুযায়ী চার কিস্তির অর্থ পরিশোধ করার পর গত ৪ মে প্লটটির বাস্তব দখল বুঝিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। পরে তাকে শুনানিতে ডাকা হয় এবং ৬ জুলাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে তিনি বক্তব্য দেন। তবে এরপরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইসলামা বেগমের অভিযোগ, গৃহায়নের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশ করে একটি চক্র জাল কাগজপত্র তৈরি করে তার বরাদ্দকৃত প্লট দখলের চেষ্টা করছে। তিনি বরাদ্দ-সংক্রান্ত নথি যাচাই করে দ্রুত বাস্তব দখল বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
### ডিজিটালাইজেশন না হওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো নথিগুলো পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত না থাকায় নথি হারানো ও জালিয়াতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সংস্থাটিকে ডিজিটালাইজ করার জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
কর্তৃপক্ষের মতে, পুরোনো কাগজের নথির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালচক্র অনিয়ম করছে। একটি প্লটের তথ্য পরিবর্তন করে অন্য ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেখানোর মতো অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে পাওয়া গেছে।
এ ধরনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্লট ও ফ্ল্যাট গ্রহীতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাটির ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
### কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, নিখোঁজ নথির বিষয়টি তদন্তাধীন। রেকর্ডরুম থেকে নথি নেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হিসেবে শনাক্ত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে অফিস সহকারী মালেকিন নাছির বলেন, আটটি নথি তিনি রেকর্ডরুম থেকে নেননি এবং নথিগুলো নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তার কোনো তথ্য নেই। তাকে একটি নথির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল এবং সেটি রেকর্ডরুম থেকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বুঝিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আটটি নথি গায়েবের অভিযোগকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
নথি নিখোঁজের ঘটনায় তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত ঘটনা ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।