দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার ও ব্যান্ডউইথের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও নিজস্ব অবকাঠামো সম্প্রসারণে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। একদিকে প্রতিবেশী ভারত থেকে ক্রমেই বাড়ছে ব্যান্ডউইথ আমদানি, অন্যদিকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পটি প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের অভাবে প্রায় তিন বছর ধরে সাগরের তলদেশে পৌঁছাতে পারছে না।
দেশীয় তিন প্রতিষ্ঠান মেটাকোর সাবকম, সামিট কমিউনিকেশন্স ও সিডিনেট কমিউনিকেশন্সের যৌথ উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটির মূল কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনটি সাবমেরিন ক্যাবলের সম্মিলিত সক্ষমতা ৫১ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড (টিবিপিএস)। ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ক্যাবল স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ শাখা ক্যাবল বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কাজের জন্য ভাড়া করা জাহাজ ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্র না পাওয়ায় তারা বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করতে পারছেন না।
বাংলাদেশের জলসীমায় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট জাহাজকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হয়। এই অনুমোদন প্রক্রিয়াতেই বর্তমানে প্রকল্পটির বড় বাধা তৈরি হয়েছে বলে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ।
মেটাকোর সাবকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল হাকিম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় ক্যাবল স্থাপনের কাজে নিয়োজিত জাহাজগুলো বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করতে পারছে না।
তার দাবি, প্রকল্পটি শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। ফলে বিনিয়োগের বড় অংশ সম্পন্ন হওয়ার পর এভাবে কাজ আটকে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত ২৯ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ (পিটিডি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এনএসআই প্রধানের কাছে একটি ‘জরুরি ও গোপনীয়’ চিঠি পাঠায়। এতে ‘সিএস ব্লু’ ও ‘এন্ডেভার’ নামের দুটি জাহাজকে ক্যাবল স্থাপনের জন্য বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশের অনাপত্তিপত্র না দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজ প্রবেশের অনুমতি চেয়ে আবেদন করার পরই ওই চিঠি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
পিটিডির চিঠিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডকে (বিএসসিপিএলসি) সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে পিটিডির সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো এনওসি না দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
তবে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন আমিনুল হাকিম। তার ভাষ্য, দেশে ডলার সংকটের সময় সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরামর্শ ও অনুমতি নিয়েই তিনটি প্রতিষ্ঠানের তিন জোড়া ক্যাবলের বাইরের সুরক্ষা আবরণ একত্র করা হয়েছিল। মূল ক্যাবলগুলো আলাদাই রাখা হয়।
তিনি বলেন, একটি সরকারি সংস্থা অনুমোদন দেওয়ার পর অন্য একটি সংস্থা একই কাজ আটকে দিলে বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে।
এদিকে, দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা পূরণে ভারতনির্ভরতা বাড়ছে বলে দাবি করেছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগে দেশের মোট ব্যান্ডউইথ চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে, সরকারি বিএসসিপিএলসি বর্তমানে দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত রেখেছে। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হচ্ছে, যার সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করতে পারে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করেও বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্যাবল অবকাঠামো পিছিয়ে রয়েছে বলে উদ্যোক্তারা উল্লেখ করেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনামে ছয়টি, ভারতে ২০টির বেশি, মালয়েশিয়ায় ২৪টির বেশি এবং থাইল্যান্ডে ১২টির বেশি সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে মাত্র দুটি।
ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিলে ব্যান্ডউইথের দাম কমানো সম্ভব বলেও দাবি করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। আমিনুল হাকিমের দাবি, বর্তমানে প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম প্রায় ১২০ টাকা হলেও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হলে তা ৬০ থেকে ৭০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
বিএসসিপিএলসির পক্ষ থেকে অবশ্য ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন বিশেষ অফারের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম দামে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, এসএসডব্লিউ ৪ ও ৫ ক্যাবল থেকে পাওয়া ৭ দশমিক ২ টিবিপিএস সক্ষমতার পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এসএমডব্লিউ ৬ ক্যাবল থেকে আরও ৩৪ টিবিপিএস সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ধারণা, ২০৩৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন ৪২০ থেকে ৪৫০ টিবিপিএসে পৌঁছাতে পারে। ফলে চাহিদা মেটাতে একাধিক উৎস ও প্রতিযোগিতামূলক অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, কাজের বড় অংশ শেষ হওয়ার পরও এত বড় বিনিয়োগ আটকে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। সময়মতো প্রকল্প শেষ করতে না পারায় ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে জরিমানা দিতে হতে পারে। পাশাপাশি প্রকল্প চালু না হওয়ায় আয়ও শুরু হচ্ছে না।
ক্যাবল স্থাপনের জন্য শীতকাল গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত থাকায় সাগরের তলদেশে ক্যাবল বসানোর কাজ করা সহজ হয়। ফলে দ্রুত অনুমোদন না মিললে চলতি শীতের মৌসুমও কাজে লাগানো সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা আরও দাবি করছেন, বাজারে সরকারি একচেটিয়া প্রভাব থাকলে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারে। তাদের মতে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করতে দ্রুতগতির, নির্ভরযোগ্য ও পর্যাপ্ত সক্ষমতার আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অবকাঠামো প্রয়োজন।
সিডিনেট কমিউনিকেশন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, গত কয়েক বছরে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যান্ডউইথ আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা দেশের নিজস্ব সাবমেরিন ক্যাবল অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা যেত।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বেসরকারি প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দেশের ব্যান্ডউইথের বড় অংশই ভারত থেকে আমদানি করতে হতে পারে।
এদিকে, প্রকল্পটির অনুমোদন ও জটিলতা নিয়ে বিএসসিপিএলসি ও পিটিডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে বিদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানি বাড়ছে, অন্যদিকে বিপুল বিনিয়োগে নির্মাণাধীন দেশীয় বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প অনুমোদনের জটে আটকে থাকায় দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর সক্ষমতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রূপক/ 23-09-26