‘মনে হয়েছিল আর দেশে ফেরা হবে না’-হরমুজের বিভীষিকা বর্ণনা নাবিকের
মধ্যপ্রাচ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ ১১৫ দিন আটকে থাকার পর দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ১৭ নাবিক। দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মানসিক চাপের মধ্যে কাটানোর পর স্বজনদের কাছে ফিরতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তারা।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটিতে মোট ৩১ জন নাবিক কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ অবস্থায় দায়িত্ব পালন করায় শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়া নাবিকদের মধ্যে ১৭ জনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর আব্দুল মালেক জানান, দেশে ফেরা নাবিকদের মধ্যে জাহাজের মাস্টার, চিফ অফিসার, প্রকৌশলী, ক্যাডেট এবং রেটিং পর্যায়ের সদস্যরা রয়েছেন। তারা ইতোমধ্যে নিজ নিজ পরিবারের কাছে পৌঁছেছেন।
দেশে ফিরে আসা নাবিকদের একজন, ২৪ বছর বয়সী থার্ড অফিসার মো. আরিফ ইফতেখার বলেন, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার কারণে একসময় মনে হয়েছিল হয়তো আর কখনো দেশে ফেরা হবে না। তিনি জানান, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং চারপাশের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক তৈরি করেছিল। বিকট শব্দ ও সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় অনেক সময় রাতেও ঘুম ভেঙে যেত।
জাহাজটির মাস্টার শফিকুল ইসলাম খান বলেন, দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন এবং অবরুদ্ধ অবস্থার কারণে নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বেড়ে গিয়েছিল। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বিএসসি পর্যায়ক্রমে নাবিকদের বদলির সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি জানান, প্রায় নয় মাস পর দেশে ফিরতে পেরেছেন তিনি, আর তার কয়েকজন সহকর্মীর দেশে ফিরতে সময় লেগেছে প্রায় ১০ মাস। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দর থেকে এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে যাত্রা করে গত ২১ জুলাই ঢাকায় পৌঁছান এসব নাবিক।
কীভাবে আটকে পড়েছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ টন ধারণক্ষমতার বাল্ক ক্যারিয়ার ‘বাংলার জয়যাত্রা’ একটি আন্তর্জাতিক চার্টার চুক্তির আওতায় চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে। কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বহন করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পণ্য খালাসের পর অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি দীর্ঘ ১১৫ দিন সেখানে নোঙর করে থাকতে বাধ্য হয়।
অবশেষে গত ২৩ জুন প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে পৌঁছে। সেখানে জ্বালানি গ্রহণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
আর্থিক ক্ষতি হয়নি
বিএসসি জানিয়েছে, পুরো সময় জাহাজটি চার্টার চুক্তির আওতায় পরিচালিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি। জাহাজের কার্যক্রম সচল রাখতে দেশে ফেরা ১৭ নাবিকের পরিবর্তে সমসংখ্যক নতুন নাবিককে ইতোমধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে পাঠানো হয়েছে এবং তারা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বর্তমান ভ্রমণ শেষে ‘বাংলার জয়যাত্রা’র সম্ভাব্য গন্তব্য মালয়েশিয়া। সেখানে পৌঁছানোর পর জাহাজে থাকা বাকি ১৪ নাবিকের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে পর্যায়ক্রমে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।