গ্যাস সংকটে স্থবির শিল্পাঞ্চল, ভোগান্তিতে গ্রাহক
কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এলএনজি) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সৃষ্ট সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা, শিল্পাঞ্চল ও সিএনজি স্টেশনে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে শিল্পকারখানাগুলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যোগ হয় ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট, ফলে বিদ্যমান ঘাটতি আরও বেড়ে গেছে।
রাজধানীতে রান্নার সংকট
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকছে। অনেক এলাকায় চুলা জ্বালানোই সম্ভব হচ্ছে না।
পরিস্থিতির কারণে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার কিংবা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের রান্না সেরে রাখছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গ্যাসের অভাবে নিয়মিত রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে, যা বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও চাপ
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসচাপ কমে যাওয়ায় অনেক স্টেশন দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেসব স্টেশন চালু রয়েছে, সেগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় অনেক স্টেশনে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পরিবহন খাতেও ভোগান্তি বাড়ছে।
মুন্সীগঞ্জে মাটির চুলায় ফিরছে মানুষ
মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার কাঠের জ্বালানিতে মাটির চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। কেউ কেউ এলপিজি সিলিন্ডারের মাধ্যমে রান্নার কাজ চালাচ্ছেন।
গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কারখানা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বস্ত্র, স্পিনিং, নিটিং, ডাইং ও কম্পোজিট কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
শিল্পমালিকরা জানিয়েছেন, বয়লার চালাতে যেখানে নির্দিষ্ট মাত্রার গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক কারখানায় তা নেমে এসেছে অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লায় চরম ভোগান্তি
কুমিল্লা শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় আবাসিক গ্রাহকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক পরিবার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছে।
এদিকে শিল্পকারখানাগুলোও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও কার্যক্রমে বিঘ্নের মুখে পড়েছে।
টঙ্গীতে বিক্ষোভ, ‘নো গ্যাস, নো বিল’ হুঁশিয়ারি
গাজীপুরের টঙ্গীতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবিতে তিতাস গ্যাসের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় গ্রাহকরা। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না তারা। তারা দ্রুত সংকট সমাধানের দাবি জানিয়ে সতর্ক করেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ‘নো গ্যাস, নো বিল’ কর্মসূচিসহ আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যেতে পারেন।
অন্যান্য জেলাতেও একই চিত্র
সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলায় গ্যাস সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। কোথাও সিএনজি স্টেশন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। অনেক এলাকায় গ্যাসচাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসায় সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত চালু না হলে দেশের গ্যাস সংকট আরও গভীর হতে পারে। এর প্রভাব জনজীবনের পাশাপাশি শিল্প ও অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।