‘সমালোচনা মানে বিভাজন নয়’: মাহফুজ আলমকে ঘিরে ফরহাদ মজহার প্রতিক্রিয়া
কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তরুণ রাজনৈতিক কর্মী মাহফুজ আলম-এর ব্যবহৃত ‘পালনবাদ’ পরিভাষা নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি গণঅভ্যুত্থান, রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং তরুণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়েও বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেছেন।
ফেসবুক পোস্টে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘পালনবাদ’ শব্দ বা পরিভাষার ব্যবহার নিয়ে তিনি কড়া সমালোচনা করলেও সেটির অর্থ এই নয় যে গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর কোনো মৌলিক রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। বরং রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি লেখেন, গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শক্তিগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে-বাংলাদেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নতুন করে গড়ে তোলা। তাঁর মতে, শুধু পুরোনো রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার নয়, বরং ক্ষমতার সম্পর্ক, জনগণের অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
ফরহাদ মজহার আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক কর্পোরেট পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চল এক ধরনের প্রান্তিক ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ নয়; বরং এটি সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি ও বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই রাজনীতি এখনও গঠনের মধ্যে রয়েছে। এর ভাষা, ধারণা ও কৌশল এখনও পরীক্ষাধীন। তাই তরুণ নেতৃত্বকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে সমালোচনা, পর্যালোচনা ও ধারণাগত শুদ্ধির মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
‘পালনবাদ’ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, সমাজ, সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ বা পারস্পরিক দায়িত্ববোধের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রগঠনের জটিল রাজনৈতিক প্রশ্নকে শুধুমাত্র নৈতিকতা বা আবেগের জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখলে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাঁর ভাষায়, জনগণকে ‘পালিত’ সত্তা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রগঠনের মূল কর্তা হিসেবে দেখতে হবে। যে কোনো নতুন রাজনৈতিক ধারণা বা পরিভাষাকে জনগণের ক্ষমতায়ন ও গণসার্বভৌমত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টের শেষদিকে ফরহাদ মজহার বলেন, সমালোচনা মানে বিভাজন বা শত্রুতা নয়। বরং নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে ভাষা, ধারণা ও রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী করাই এ ধরনের বিতর্কের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। “জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু শাসক পরিবর্তনের প্রশ্ন তোলে নাই; রাষ্ট্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তির মৌলিক প্রশ্নগুলোকেও সামনে নিয়ে এসেছে।”