ঢাকাকে পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে বহুমুখী উদ্যোগ সরকারের
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে একটি পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মিলনায়তনে আয়োজিত ‘নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: আমার, আপনার, সকলের দায়িত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, রাজধানী ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা নতুন নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জ। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় ঢাকায় প্রতিনিয়ত জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। এর ফলে নগর পরিকল্পনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ ও আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, “একটি পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নগর গড়ে তোলা শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব।”
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, ঢাকার নগরজীবনে গ্রামীণ ও শহুরে সংস্কৃতির একটি মিশ্র প্রভাব রয়েছে। এ কারণে নাগরিক সচেতনতা ও শৃঙ্খলাবোধ বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি আধুনিক নগর সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। তিনি এআইনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, কার্যকর তদারকি এবং সচেতনতা সৃষ্টি করা গেলে মানুষ নিয়ম মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়। একইভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, কার্যকর এবং জনবান্ধব করতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকার, সিটি কর্পোরেশন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নগর ব্যবস্থাপনায় যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, তা দূর করতে সিটি কর্পোরেশনগুলোকে আরও স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনগুলোকে শক্তিশালী করা গেলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশসহ নগর উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, রাজধানীর বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে আমিনবাজার ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মাতুয়াইলে দুটি ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ (বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিচ্ছন্নতা ও নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। মীর শাহে আলম বলেন, আগামী বছর থেকে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতা এবং পরিচ্ছন্নতা-সংক্রান্ত বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে উন্নত নাগরিক বোধ গড়ে ওঠে।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক তার বক্তব্যে বলেন, নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং ছোট ছোট উদ্যোগকে একটি বৃহৎ সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।
তিনি বলেন, “পরিচ্ছন্ন নগর গঠনে আমাদের সবাইকে অংশীদার হতে হবে। ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ছাড়া এ ধরনের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়।”
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক) ড. মো. সাইমুম পারভেজ, ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, স্থানীয় সরকার বিভাগের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক পরামর্শক মো. শাহীন আহমেদ খানসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সেমিনারে বক্তারা সম্মিলিতভাবে মত দেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর ও টেকসই করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজধানীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করা সম্ভব।